সংযুক্ত আরব আমিরাতের শহর আবুধাবির দৃশ্য। ৩ জানুয়ারি ২০১৯, আবুধাবি
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শহর আবুধাবির দৃশ্য। ৩ জানুয়ারি ২০১৯, আবুধাবি

আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানের কোন নাগরিকদের বহিষ্কার করা হচ্ছে, কী তাঁদের অপরাধ

শুরুতে এই বহিষ্কারের বিষয়টি কারও নজরে আসেনি। পাকিস্তানজুড়ে শহর–গ্রামে অল্প কিছু শ্রমিক হঠাৎ করেই ফিরে আসতে থাকেন। তাঁদের সঙ্গে কোনো মালপত্র ছিল না। এমনকি তাঁদের পরিবারও জানত না তাঁরা ফিরছেন।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সারা দেশে এই ধরনের বহিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারগুলো তাদের ছেলে, ভাই ও বাবাদের ফিরে আসতে দেখে, যাঁদের বেশির ভাগই শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের। তাঁরা জীবনের বড় একটা অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কাজ করে কাটিয়েছেন। এই ব্যক্তিরা জানান, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁদের হঠাৎ করে ধরে বহিষ্কার করা হয়েছে।

পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের শিয়া নেতারা ‘মিডল ইস্ট আই’কে বলেছেন, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে হাজার হাজার পাকিস্তানি শ্রমিককে বহিষ্কার করা হয়েছে, যাঁদের অধিকাংশই দীর্ঘকাল আরব আমিরাতে কর্মরত ছিলেন।

বহিষ্কার হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেরই অভিযোগ, আমিরাত কর্তৃপক্ষ তাঁদের বের করে দেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানায়নি। তবে ভুক্তভোগী ও তাঁদের প্রতিনিধিদের ধারণা, ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি আরব আমিরাতের ক্রমবর্ধমান সন্দেহেরই প্রতিফলন এটি।

আফগান সীমান্ত–সংলগ্ন পাকিস্তানের খুররাম জেলার ৪৫ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক হুসাইন তুরি বলেন, ‘তারা আমাদের কোনো কারণ বলেনি। কিন্তু আমরা বুঝেছি। আমাদের একমাত্র অপরাধ, আমরা শিয়া।’

সাম্প্রতিক সময়ে আমিরাত থেকে কেবল হুসাইনের গ্রামেই প্রায় ২০০ জন ফিরে এসেছেন।

বহিষ্কারের এই প্রক্রিয়াটি ছিল আকস্মিক ও অস্বচ্ছ। বেশ কয়েকজন শ্রমিক বলেন, তাঁদের কোনো কারণ ছাড়াই স্থানীয় থানায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক দিন আটকে রাখার পর কোনো আইনি সহায়তা বা আপিল করার সুযোগ না দিয়েই সরাসরি পাকিস্তানের ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয়।

এই শ্রমিকদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে আরব আমিরাতের নির্মাণ, পরিবহন ও সেবা খাতে কাজ করে দেশে অর্থ পাঠাতেন, যার ওপর তাঁদের পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। কাতারেও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যেখানে বছরের শুরুতে একই পরিস্থিতিতে কিছু শিয়া সম্প্রদায়ের শ্রমিক বহিষ্কারের শিকার হন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই খবর আসার পর বিষয়টি সবার নজরে আসে। তবে পাকিস্তান সরকার উপসাগরীয় দেশগুলো নির্দিষ্টভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষকে নিশানা বানিয়েছে—এমন অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।

৮ মে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ধরনের খবর বিভ্রান্তিকর এবং কুচক্রী মহলের প্রচারণার অংশ। তারা দাবি করেছে, আরব আমিরাতসহ কোনো দেশেই নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বহিষ্কার করা হচ্ছে না।

সংযুক্ত আবর আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল–নাহিয়ান

সরকারি অস্বীকার সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রদেশের শিয়া নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শিয়া কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশিষ্ট আলেম আল্লামা আমিন শাহিদী অনুমান করছেন, প্রায় ১৫ হাজার পাকিস্তানিকে বহিষ্কার করা হয়েছে বা আবার ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে সঠিক তথ্যের অভাবে এই সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ভারতের শিয়া সংগঠনগুলোও আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে ভারতীয় শিয়াদের আটক ও আচরণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব বহিষ্কার ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঘটলেও ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাদের ওপর বছরের পর বছর ধরে নজরদারি চলছে।

নজরদারি ও প্রোফাইলিং

পরিচয় প্রকাশ পেলে আমিরাতে রেখে আসা সঞ্চয়, ব্যবসা বা বকেয়া বেতন আদায়ের সুযোগ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে—এই ভয়ে অধিকাংশ বহিষ্কৃত ব্যক্তি নাম প্রকাশ করতে চাননি।

পাঞ্জাব প্রদেশের চাকওয়াল জেলার কায়সার নামের এক ব্যক্তি বলেন, দুবাই মলে থাকাকালে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাঁকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। তিনি বলেন, ‘তারা আমার কাছে এসে সরাসরি আইডি কার্ড চাইল। তারা আগে থেকেই জানত, আমি কে।’

অভিযোগ উঠেছে, ইমামবারগাহ বা শিয়াদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রবেশ করতে হলে এখন এমিরেটস আইডি কার্ড স্ক্যান করতে হয়। এই বায়োমেট্রিক তথ্য এবং যাতায়াতের রেকর্ড ব্যবহার করেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলো শিয়াদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। পরে তাঁদের আটক শুরু করেছে। সুন্নি মসজিদগুলোতে এই ধরনের কড়াকড়ি সাধারণত দেখা যায় না।

আব্রাহাম অ্যাকর্ড ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি

২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব আমিরাতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর (আব্রাহাম অ্যাকর্ড) থেকে শিয়াদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি অনেক বেড়ে গেছে। আব্বাস নামের এক স্থপতি জানান, ‘ইমামবারগাহে আইডি কার্ড স্ক্যান করার কারণে মানুষ এখন সেখানে যেতে ভয় পায়।’

এই কড়াকড়ির গ্যাড়াকলে পড়ে মাঝে মাঝে সুন্নি সম্প্রদায়ের মানুষও বিপদে পড়ছেন। সরগোধার শ্রমিক রাজিক জানান, তিনি সুন্নি হওয়া সত্ত্বেও ফ্রিতে খাবার খেতে মাঝে মাঝে ইমামবারগাহে যেতেন। এ কারণে তাঁকে শিয়া মনে করে ভুলবশত দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

অনেকের দাবি, শিয়াদের সঙ্গে সম্পর্কিত পদবি (যেমন—জাইদি, আসকারি, জাফরি, হুসাইন, তুর্কি ইত্যাদি) থাকলে এখন ভিসা বা কাজের অনুমতি পেতে দেরি হচ্ছে অথবা বাতিল করা হচ্ছে। এমনকি খুররাম বা কোহাটের মতো শিয়াপ্রধান এলাকা থেকে আসা আবেদনকারীদের অতিরিক্ত স্ক্রিনিংয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশে সন্দেহ এবং ‘বিলায়ত-আল-ফকিহ’

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই বহিষ্কারের ঘটনাগুলো ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকেই আরব আমিরাত ও সৌদি আরব শিয়াদের ইরানের প্রভাব হিসেবে দেখে আসছে।

বিশেষ করে ‘বিলায়ত-আল-ফকিহ’ (ইসলামি আইনবিশারদের অভিভাবকত্ব) মতবাদটি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। তারা মনে করে, এই মতাদর্শের কারণে শিয়া মুসলিমরা তাদের নিজ দেশের রাজতন্ত্রের চেয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি বেশি অনুগত থাকে।

গত ২০ এপ্রিল আরব আমিরাত দাবি করেছে, তারা ইরানপন্থী একটি গোপন সংগঠন ভেঙে দিয়েছে, যারা এই মতাদর্শে বিশ্বাসী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়া এবং শিয়াদের মধ্যে এর প্রভাব আমিরাতের সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে হাজার হাজার পাকিস্তানি কর্মী নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, যাঁদের আয়ের কোনো পথ নেই। আমিরাতে ফেলে আসা সম্পদ ফিরে পাওয়ার কোনো আইনি সুযোগও নেই।