
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থকদের দাবি, তাঁর আহ্বানে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। এতে করে তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁরা বলছেন, চলমান বিক্ষোভ একধরনের গণভোট (রেফারেন্ডাম) হয়ে গেছে, যাতে রেজা পাহলভি জয়ী হয়েছেন।
কিন্তু আসলে কি তাই? ইরানে বিকল্প নেতৃত্ব কেমন হতে পারে, সেই বিতর্কের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিক্ষোভকারীরা ধর্মীয় নেতাদের ৪৭ বছরের শাসনের অবসান চাইলেও রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনকে এখনো অনেকে সন্দেহের চোখে দেখেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত রেজা পাহলভিকে সমর্থন দেননি।
বিদেশ থেকে সম্প্রচারিত রাজতন্ত্রপন্থী ফারসি ভাষার স্যাটেলাইট চ্যানেলসহ বিভিন্ন মাধ্যম রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে। বিক্ষোভে শাহর প্রতি সমর্থনকে তারা বেশি বেশি প্রচার করছে।
রেজা পাহলভির প্রতি ট্রাম্পের আচরণ ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর মাচাদোকে তাড়াহুড়ো করে সমর্থন দেননি ট্রাম্প। তেমনি রেজা পাহলভিকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েও ট্রাম্প একইভাবে সতর্ক। মনে হচ্ছে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে ওয়াশিংটন কিছুটা শঙ্কিত।
বিক্ষোভকারীরা প্রধানত দুর্নীতি ও নিপীড়ন বন্ধ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছেন। এই মুহূর্তে তাঁদের মধ্যে বিকল্প নেতৃত্ব এতটা স্পষ্ট নয় এবং এখন পর্যন্ত তাঁদের একক কোনো রাজনৈতিক দাবিদাওয়াও নেই।
এই রাজনৈতিক শূন্যতা রেজা পাহলভির জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। কারণ, তাঁর নামটি পরিচিত এবং দশকের পর দশক ধরে রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে একটা সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন।
অন্যদিকে ইরানের ভেতরে যাঁরা দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে পারতেন, তাঁরা বছরের পর বছর ধরে কারাগারে বন্দী। এসব নেতৃত্বের মধ্যে নার্গিস মোহাম্মদি ও মোস্তফা তাজজাদেহ অন্যতম।
এক ইরানি নাগরিক মনে করেন, ইরান এ মুহূর্তে কোনো একক রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রের (ম্যানিফেস্টো) অবস্থায় নেই। অতীতের মতো গত শুক্রবারও নিজ সমর্থকদের রাস্তায় বিক্ষোভ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন রেজা পাহলভি। আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে ট্রাম্পের মালিকানাধীন রিসোর্ট মার-আ-লাগোতে একটি অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
তবে রেজা পাহলভির প্রতিনিধিরা বলেছেন, তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের সাক্ষাতের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ‘জেরুজালেম প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ নামের বার্ষিক এ অনুষ্ঠানের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রতিনিধিত্বকারী দলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
ট্রাম্প কী চাইছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প হয়তো ইরানের বর্তমান সরকারের কোনো অংশের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছেন। ওমানের কর্মকর্তারা সপ্তাহান্তে তেহরান সফরে যাবেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় সাধারণত ওমান ভূমিকা রাখে।
ইরানের বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে এরই মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও তা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সিদ্ধান্তকে তেমন একটি প্রভাবিত করতে পারছে না। তিনি এখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার পক্ষে। তাঁর কাছে এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক।
ট্রাম্প কেন রেজা পাহলভিকে পূর্ণমাত্রায় সমর্থন দিতে রাজি নন, সেটার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর একটি হলো ট্রাম্প তাঁকে সমর্থন দিলে ইরানে তাঁর প্রত্যাবর্তনের আহ্বান নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গার্ডিয়ান–এর কাছে ইরানের এক নাগরিক বলেন, ‘আজকের স্লোগানে যা শোনা যাচ্ছে, তা রাজতন্ত্রের ফেরার আহ্বান নয়। বরং এটি প্রাণঘাতী বাস্তবতা থেকে বাঁচার উপায়। যে সমাজে সমস্যা সমাধানের কোনো পথ খোলা নেই, তাতে পেছনে (রাজতন্ত্র) ফিরে যাওয়ার কথা ওঠে কোনো আগ্রহ থেকে নয়, বরং বাধ্য হয়েই তাঁরা এমনটি করেন। এই পশ্চাদমুখী যাত্রা কোনো বিকল্প নয়। এটি ক্লান্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার হতবিহ্বল প্রতিক্রিয়া, যা আর কোনো নির্দেশনা মেনে চলার অবস্থায় থাকে না।’