
সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি আজ সোমবারও সৌদির একটি বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। পাশাপাশি ইয়মেনের অভ্যন্তরে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের গতকালের নির্ধারিত বৈঠক শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে যায়। বৈঠকটি ওমানে হওয়ার কথা ছিল।
হুতিদের দাবি, সোমবার তারা সৌদির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এ হামলার লক্ষ্য ছিল বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার–ব্যবস্থা, রানওয়ে, গোলাবারুদের গুদামসহ সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো।
গতকাল রোববার সৌদি কর্তৃপক্ষ খামিস মুশাইতসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরে অল্প সময়ের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করেছিল। ওই দিন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছিল হুতিরা। তাদের ভাষ্যমতে, গত কয়েক দিনে ইয়েমেনে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে ৩০০টির বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বাহিনী। এর জবাবে দেশটিতে পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে এ হামলার বিষয়ে কিছু জানায়নি। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আজ জেদ্দায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদির রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, আঞ্চলিক সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
কয়েক দিন আগে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন সৌদি যুবরাজ। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প হুতিদের ওপর সরাসরি মার্কিন হামলায় রাজি হননি। তবে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্যসহ হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রও চাপে পড়েছে। সৌদি আরবের মিত্র হিসেবে দেশটিকে সহায়তা করতে চায় ওয়াশিংটন। তবে একই অঞ্চলে আরেকটি রণক্ষেত্রে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক ট্রাম্প প্রশাসন।
হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় যেতে হতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।সুলতান বারাকাত, অধ্যাপক, হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়, কাতার
হুতিদের দখলে আরও দ্বীপ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এপি জানিয়েছে, হুতিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলের গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ নামে আরও দুটি দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দুটির অবস্থান বাব আল–মানদেব প্রণালি থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তরে। সেখান থেকে সরকারি বাহিনীর সদস্যরা সরে যাওয়ার পর হুতিরা দ্বীপ দুটি দখল করে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার তারা একই অঞ্চলের বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরের দিন শুক্রবার দখল করে বাব আল–মানদেবের ভেতরের মাইয়ুন দ্বীপ।
বাব আল–মানদেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। অঞ্চলটিতে হরমুজ প্রণালির পর এটি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সৌদি আরবের তেল এশিয়ার বাজারে পাঠানো হয় মূলত এ পথ দিয়ে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় নৌপথটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
আল–জাজিরা জানায়, ইয়েমেনে সৌদি–সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। হুতিদের কাছ থেকে কয়েকটি এলাকা পুনর্দখল করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশের পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে সরকারি বাহিনী। গত রোববার ওই অঞ্চলে হুতিদের আক্রমণ প্রতিহত করার পর তারা এগিয়ে যায়। স্থল অভিযানের পাশাপাশি হুতিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলাও চালানো হচ্ছে।
দুই পক্ষের লড়াই ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের মারিবে প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে সামরিক ঘাঁটিসহ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসকেন্দ্র রয়েছে।
হরমুজ বৈঠক স্থগিত
হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ওমানে আজ বৈঠকের সূচি নির্ধারিত ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে সেটি স্থগিত হয়ে যায়।
সৌদি আরবের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত হয়েছে বলে জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। বৈঠক স্থগিতে ইয়েমেন পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে রিয়াদ। তবে একে ‘মিথ্যা অজুহাত’ বলে মন্তব্য করেন বাঘাই।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদি অবশ্য বলেছেন, বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’।
কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত আল–জাজিরাকে বলেন, ‘হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতায় যেতে হতে পারে।’ তাঁর মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ওমানে গতকাল বৈঠকের সূচি নির্ধারিত ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে সেটি স্থগিত হয়ে যায়।
তেলের বাজারে চাপ
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরুর প্রভাব জ্বালানি বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। সাপ্তাহিক ছুটি শেষে গতকাল বাজার খোলার পর অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
এর আগে হুতিদের অগ্রযাত্রার মধ্যে গত শুক্রবার ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পাইপলাইনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল সৌদি আরব। পাইপলাইনটি কয়েক দিনের মধ্য চালু না হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রায় ৮৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। তাদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরের দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে।
তাইজের কাছে সরকারি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন আয়েশা মুহাম্মদ। পার্শ্ববর্তী সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে পালিয়ে আসা এই বৃদ্ধা রয়টার্সকে বলেন, দুই মেয়ে ও তিন ছেলে তাঁর সঙ্গে আসতে পারেননি। তাঁরা খাবার ও পানি কিনতে বাজারেও যেতে পারছেন না। ঘরেই আটকা পড়ে আছেন।