মিডল ইস্টের প্রতিবেদনের ছবির স্ক্রিনশট
মিডল ইস্টের প্রতিবেদনের ছবির স্ক্রিনশট

ফিলিস্তিনের পাঠ্যবই থেকে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দ বাদ দিতে বলা ব্লেয়ারই এখন গাজার শান্তি পর্ষদে

ইসরায়েলের নৃশংস ও নির্বিচার হামলায় বিধ্বস্ত জনপদ গাজায় ‘শান্তি প্রতিষ্ঠায়’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ (শান্তি পর্ষদ) সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে ফিলিস্তিনে পাঠায়। পাঠ্যবই থেকে ‘প্যালেস্টাইন’ তথা ফিলিস্তিন শব্দটি বাদ দিয়ে সেখানে ইহুদিদের দেওয়া নাম ‘সামারিয়া’ লেখার জন্য তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) প্রস্তাব দেন। মিডল ইস্ট আই (এমইই) এ তথ্য জানতে পেরেছে।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ছিলেন জেরেমি গ্রিনস্টক। তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ব্লেয়ার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তিনি আরও বলেন, গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর সক্ষমতা আছে—পিস বোর্ডের কাছে এমন ভাবমূর্তি তৈরি করতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিই আগ্রহী হয়ে থাকে, তবে পাঠ্যবই থেকে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দটি মুছে ফেলা উচিত বলে ব্লেয়ার জানিয়েছিলেন।

গ্রিনস্টক বলেন, প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সাফ জানিয়ে দেন, তিনি এমন কাজ কিছুতেই করবেন না।

‘ডেভিড হার্স্ট পডকাস্ট’-এ দেওয়া এক বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে গ্রিনস্টক জানান, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এ অন্যায্য দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

গ্রিনস্টক আরও জানান, পর্ষদের হয়ে যুদ্ধোত্তর গাজা ব্যবস্থাপনার তদারকি করতে গিয়ে তাঁর সাবেক বস টনি ব্লেয়ার এখন বেশ ‘ঝামেলা ও জটিলতায়’ পড়েছেন।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘আমি যতটুকু জেনেছি, শান্তি পর্ষদ সম্প্রতি ব্লেয়ারকে রামাল্লায় পাঠায়। উদ্দেশ্য ছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি করার মতো যোগ্যতা দেখাতে হলে ফিলিস্তিনের পাঠ্যক্রম থেকে প্যালেস্টাইন শব্দ বাদ দিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো।’ গ্রিনস্টক জানান, তিনি মন্ত্রী পর্যায়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এ তথ্য পেয়েছেন।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সাফ জানিয়ে দেন, তিনি এমন কাজ কিছুতেই করবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘শান্তি পর্ষদ ফিলিস্তিনের শিক্ষাক্রম নিয়ে এমন দাবি তুলতে পেরেছে—এটি ভেবেই আমি বিস্মিত। কোন নীতিতে তারা কাজ করছে? ন্যায়বিচার, সততা কিংবা এ সংকটের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।’

শান্তি পর্ষদ ফিলিস্তিনের শিক্ষাক্রম নিয়ে এমন দাবি তুলতে পেরেছে—এটি ভেবেই আমি বিস্মিত। কোন নীতিতে তারা কাজ করছে? ন্যায়বিচার, সততা কিংবা এ সংকটের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের আদৌ কোনো ধারণা আছে কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে।

তবে টনি ব্লেয়ারের এক মুখপাত্র এ দাবির কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি পুরোপুরি অসত্য এবং সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি কথা।’

জানা গেছে, গত আগস্টের মাঝামাঝি ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও গাজাবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলে ম্লাদেনভকে সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েল সফর করেন টনি ব্লেয়ার। সেখানে তাঁরা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও নেতানিয়াহু গাজাসংক্রান্ত ট্রাম্পের এমন ‘শান্তি পরিকল্পনা’ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

এরপর তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলটি কায়রো যায়। সেখানে তারা গাজার দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট দলের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে।

সাক্ষাৎকারে গ্রিনস্টক ইরাক যুদ্ধে ব্লেয়ারের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, ইরাকে হামলার আগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে জাতিসংঘের অনুমোদন নেওয়ার ব্যাপারে রাজি করান ব্লেয়ার। তবে গাজা পুনর্গঠনে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ ব্লেয়ারের বর্তমান ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

গ্রিনস্টক বলেন, উভয় পক্ষকে সমান মর্যাদা দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার মতো নিরপেক্ষ অবস্থানে ব্লেয়ার নেই। তিনি বলেন, ‘ইরাক যুদ্ধ এবং যুক্তরাজ্যে সরকারি ক্ষমতা ছাড়ার পর ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্লেয়ারের কর্মকাণ্ডের কারণে সবাই তাঁকে পক্ষপাতদুষ্ট ভাববেন। তাই আমি মনে করি, তিনি এ কাজে কঠিন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং সামনেও হবেন।’

২০০৪ সালের মার্চে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান গ্রিনস্টক। তিনি বোর্ড অব পিসকে একটি ‘অবাস্তব ও খামখেয়ালি কমিটি’ হিসেবে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, এমন কাঠামোর কমিটি ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েল বা আরব বিশ্ব—কাউকেই মাঠপর্যায়ে প্রভাবিত করতে পারবে না।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেসব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেই গুরুভার বহন করার মতো মজবুত ভিত্তি এ শান্তি পর্ষদের নেই।’

গত বছরের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ বন্ধে একটি যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করে ওয়াশিংটন। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত এ শান্তি পর্ষদ গঠন করেন। ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী তাদের নিরস্ত্রীকরণে সম্মতি জানিয়েছিল। কিন্তু এ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানায় ইসরায়েল।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজাজুড়ে দফায় দফায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এসব হামলায় অন্তত ১ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

গত মঙ্গলবার গাজা সিটির পশ্চিম অংশে মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে অন্তত সাতটি বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এরপর এলাকাটি কোয়াডকপ্টার ড্রোন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। ড্রোন থেকে চলাচলরত যেকোনো মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো ও বিস্ফোরক ফেলা হয়।

ইতিমধ্যে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার থেকে সেখানকার সরকারি স্কুলগুলোর ৪৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর ওপর নিজেদের তৈরি পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দেওয়া শুরু করেছে তারা।

ফিলিস্তিনের নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টা

ইতিহাসের বই ও জাদুঘর থেকে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দটি মুছে ফেলতে বিশ্বজুড়ে তৎপরতা জোরদার করেছে ইসরায়েল ও ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটির সমর্থকেরা।

ইতিমধ্যে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার থেকে সেখানকার সরকারি স্কুলগুলোর ৪৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর ওপর নিজেদের তৈরি পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দেওয়া শুরু করেছে তারা।

মিডল ইস্ট আই জানতে পেরেছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পর্যালোচনার জন্য একটি সংশোধিত পাঠ্যক্রম গোপনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে লেবাননে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ–এর পাঠ্যক্রম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। ইসরায়েল সংস্থাটিকে আগেই নিষিদ্ধ করেছে।

লেবাননে ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত ষষ্ঠ শ্রেণির আঞ্চলিক ভূগোলের কিছু মানচিত্রে ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দের জায়গায় ‘ওয়েস্ট ব্যাংক’ (পশ্চিম তীর) ও ‘গাজা উপত্যকা’ লেখা হয়। এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সেখানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়।

ইউএনআরডব্লিউএ কর্মীরা সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত বলে ইসরায়েল যে অভিযোগ তুলেছিল, ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাথরিন কোলোনার নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল তার সত্যতা পায়নি। তবে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা আরও বাড়াতে তদন্ত দল ৫০টি সুপারিশ পেশ করে।

এদিকে লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রদর্শনী থেকে ‘ফিলিস্তিন’ ও ‘ইসরায়েলি দখলদারত্ব’ শব্দগুলো মুছে ফেলার ঘটনা তদন্তের দাবি জানিয়েছে ব্রিটিশ এমপিদের একটি সর্বদলীয় জোট।

মিডল ইস্ট আইয়ের এক অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ইসরায়েলপন্থী লবিস্টদের চাপের মুখে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এ শব্দগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য বর্জনের দাবি তোলা সাবেক রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে গ্রিনস্টক অন্যতম। সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামকে সতর্ক করেন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘বার্নহাম সরকার যদি মৌলিক নীতিতে অটল না থাকে, তবে তারা অন্য কোথাও নীতির কথা কীভাবে বলবে?’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘জাতিসংঘের সনদ ভেঙে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের কারণে বার্নহাম কিয়েভে গিয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে সমর্থন দেবেন, আর মধ্যপ্রাচ্যে আরব-ইসরায়েল প্রশ্নে ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াবেন না—তা কীভাবে হয়?’

গ্রিনস্টক বলেন, ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি যুক্তরাজ্যকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নেতানিয়াহু বা সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ব্রিটেনে এলে তাঁদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা উচিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এ দুজনের বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘জাতিসংঘের চুক্তি এবং আইসিসির সনদে স্বাক্ষর করার কারণে যুক্তরাজ্য আইনিভাবে দায়বদ্ধ। আইসিসির বিচারকদের জারি করা পরোয়ানা অনুযায়ী অভিযুক্ত যে কাউকেই গ্রেপ্তার করা উচিত।’

গ্রিনস্টক বিশ্বাস করেন, পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের কর্তৃত্বে আনা নেতানিয়াহুর আকাঙ্ক্ষা। এর মাধ্যমে তিনি ইহুদি ইতিহাসের গবেষক তাঁর বাবা বেনজিয়ন নেতানিয়াহুকে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করতে চান।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে পিতার স্বপ্ন পূরণে “জুডিয়া ও সামারিয়া”কে (পশ্চিম তীর) ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের অধীন আনাই নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলাকে তিনি সেই উদ্দেশ্য পূরণের বড় সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন।’

গ্রিনস্টক বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত সমাজ হিসেবে ইসরায়েলের অর্জনের বড় প্রশংসাকারী হতে পারে যুক্তরাজ্য। কিন্তু ফিলিস্তিনে এবং এ অঞ্চলে ইসরায়েল যা করছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। যুক্তরাজ্যের সিংহভাগ জনগণও তা সমর্থন করেন না। রাজনৈতিক সমাধানের পথে না হেঁটে সামরিক শক্তি ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সব শত্রু নিশ্চিহ্ন করার যে নীতি ইসরায়েল নিয়েছে, এমন একটি দেশের সঙ্গে কি আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া উচিত?’

একটি সতর্কবার্তা

ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিকদের জন্যও সতর্কবার্তা দিয়েছেন গ্রিনস্টক। তিনি বলেন, ‘আমি একজন ইসরায়েলি নাগরিক হলে বিশ্বজুড়ে দেশের ভাবমূর্তি হারানোর বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগে থাকতাম। দীর্ঘ মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আপসরফা অত্যন্ত জরুরি। লড়াই শেষ হলে আরব দেশগুলো এবং ইরানের সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতেই হবে।’

গ্রিনস্টক আরও বলেন, ‘কোথাও না কোথাও একটি সমাধান বের করতেই হবে। সেনা পাঠিয়ে ইরানে ঢুকে সরকার বদলে দিয়ে চলে আসব আর ইরান পুরোপুরি বদলে যাবে—এমন ভাবা অবাস্তব। এটি কখনোই হবে না। কয়েক লাখ সেনা পাঠিয়ে ৯ কোটির বেশি মানুষের একটি দেশ দখল করা কোনো বাস্তবসম্মত চিন্তা নয়।’

গ্রিনস্টক মনে করিয়ে দেন, কসোভো যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধেই জয়ী হতে পারেনি। তিনি বলেন, আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়া এবং এখন ইরানে ধারাবাহিক ব্যর্থতার মূল কারণ হলো সামরিক শক্তির ওপর ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত নির্ভরতা। নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার অস্ত্র ব্যবহারের এ মানসিকতা বৈশ্বিক রাজনীতিতে দিন দিন মার্কিন গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে ক্ষমতা বহুভাগে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন ইতিবাচক ভাবমূর্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শক্তি প্রয়োগের চেয়ে বোঝানোর সক্ষমতা অনেক বড়। বিশ্ব এখন অনেক বেশি উন্মুক্ত এবং সরকারের বাইরেও বহুপক্ষ এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। বিশ্বমতের কাছে বলপ্রয়োগের বৈধতা এখন অনেক কমেছে।’

ইরাক যুদ্ধের সময় বুশ প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার ও ইরাকে গঠিত কোয়ালিশন প্রোভিশনাল অথরিটির প্রতিনিধি পল ব্রেমারের সঙ্গে কাজের সরাসরি অভিজ্ঞতা ছিল গ্রিনস্টকের।

সেই অভিজ্ঞতার কথা টেনে গ্রিনস্টক বলেন, ‘আমার মনে হয় সে সময় ব্রিটেনের প্রভাব ছিল। ২০০২ সালের শরতে জাতিসংঘকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য মার্কিন দলকে রাজি করিয়েছিলেন টনি ব্লেয়ার ও ব্রিটিশ দল। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলও এতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন।’

গ্রিনস্টক আরও বলেন, ‘কিন্তু ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে চূড়ান্ত সামরিক অভিযান শুরুর সময় ব্লেয়ার অভিযানটি পেছাতে চেয়েছিলেন। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। তবে মার্কিনরা তাঁর সে অনুরোধ কালক্ষেপণ বলে উড়িয়ে দেয়।’

গ্রিনস্টক বলেন, ইরাক যুদ্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্রিটেনের প্রভাব ‘প্রথম শ্রেণির’ ছিল না, বরং ছিল ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’।

এ বিষয়ে গ্রিনস্টক আরও বলেন, ‘জর্জ ডব্লিউ বুশের মূল দুই পরামর্শদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল বাস্তবতার যে দিকগুলো তুলে ধরেছিলেন, তাঁরা সেটিকে পাত্তাই দেননি। তাঁরা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেছিলেন। এমন বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের ভূমিকা ছিল নিতান্তই দ্বিতীয় শ্রেণির।’

ইরান যুদ্ধ ও ‘মক্কা চুক্তি’

গ্রিনস্টক বলেন, শুরু থেকেই ইরানের চরিত্র বুঝতে ভুল করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আরও বলেন, ‘ইরানে হামলার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন কোনো পূর্বপরিকল্পনা করেছিল বলে আমি মনে করি না।’

গ্রিনস্টক বলেন, ‘পারস্য উপসাগরের অন্য পাড়ে আঘাত হানার বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার যে সক্ষমতা ইরানের রয়েছে, ওয়াশিংটন তা সঠিকভাবে হিসাব করেনি। ড্রোন যুদ্ধের অসম শক্তিও তারা বিবেচনায় নেয়নি। ড্রোন শুধু সামরিক শক্তির ওপর আঘাত হানে না, বরং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, তেল পরিবহন এবং সাধারণ সমুদ্র বাণিজ্যের জন্যও বড় হুমকি তৈরি করে। হরমুজে মাইন পাতার পাশাপাশি জাহাজে ড্রোন হামলার ঝুঁকির বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওয়াশিংটন ভেবেই দেখেনি।’

গ্রিনস্টক বলেন, ইরানে হামলার সময় নির্ধারণ শুধু ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করেনি। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন ফাইল নিয়ে জল্পনা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ যখন তুঙ্গে উঠেছিল, ঠিক তখন ইরানে হামলা চালানো হয়। এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়।

গ্রিনস্টক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহের নজর সরাতেই হয়তো ইরানে হামলার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।’

সম্প্রতি রিয়াদে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ মূলত মার্কিন শক্তির ওপর তাদের আস্থা হারানোরই বহিঃপ্রকাশ বলেও মন্তব্য করেন গ্রিনস্টক। বলেছেন, ‘নিজেদের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার পরিষ্কার বার্তা এ মক্কা চুক্তি। তবে এটি দিয়ে স্বনির্ভরতার সব প্রয়োজন হয়তো মিটবে না। এ বিষয়ে আরও অনেক কিছু করা বাকি আছে এবং তা করা হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারানোর পেছনে দুটি প্রধান কারণ তুলে ধরেন গ্রিনস্টক। বলেন, ‘প্রথমত, আরব দেশগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র মুখে যা দাবি করে, বাস্তবে তা পূরণ করতে পারছে না।’

গ্রিনস্টক আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টতই মিত্রদের স্বার্থের চেয়ে নিজের “মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” নীতি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে আরব মিত্রদের চোখে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই কমে গেছে।’