
অপরিশোধিত তেলের বাজারে আবার সংকট শুরু হয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম লাফিয়ে ১২০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমান পরিস্থিতি সত্তরের দশকের সেই ভয়াবহ ‘জ্বালানি তেলসংকটের’ দুঃসহ স্মৃতিকেই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেলের চাহিদা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এই ব্যাপক অস্থিরতা ও আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটিমাত্র সরু নৌপথ।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পরিবহন করা হয়। এটি বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের এক-চতুর্থাংশের বেশি।
এসব জ্বালানি তেলের সিংহভাগেরই গন্তব্য এশিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া অপরিশোধিত তেলের অর্ধেকের বেশি যায় চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়।
স্বাভাবিকভাবেই এই নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হলে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোই সবার আগে এবং সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই অঞ্চলের দেশগুলোর শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজারবিষয়ক নিউজলেটার দ্য কোবেসি লেটারের ভাইরাল হওয়া একটি চার্ট এই আশঙ্কাকে আরও উসকে দিয়েছে। সেখানে সতর্ক করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তা ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেলসংকট’ তৈরি করবে।
এই সংকটের ব্যাপ্তি রীতিমতো স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো।
পরিসংখ্যান বলছে, এই পথ বন্ধ হওয়ার অর্থ বিশ্ববাজার থেকে এক ধাক্কায় প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল গায়েব হয়ে যাবে। তুলনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে দিনে ৪০ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেলের সংকট তৈরি হয়েছিল।
এমনকি ১৯৭৮ সালের ইরানের ইসলামী বিপ্লব বা ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ইরান-ইরাক যুদ্ধের ধাক্কায়ও এই সংকট দৈনিক ৪০ থেকে ৬০ লাখ ব্যারেলে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ হরমুজের সম্ভাব্য এই সংকট হবে বিগত যেকোনো বড় ধাক্কার চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি শক্তিশালী।
তবে এখানে একটি ‘কিন্তু’ আছে।
প্রতিদিন দুই কোটি ব্যারেলের এই হিসাব মূলত চরম সংকটের এমন এক চিত্র, যেখানে ধরে নেওয়া হয়েছে, ওই প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তবে বাস্তবে কিছু সরবরাহ সচল থাকার সম্ভাবনা আছে।
এ ছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক উৎপাদকেরা পাইপলাইনের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণে বিকল্প পথে তেল সরবরাহ করতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কৌশলগত মজুতও এই ধাক্কা সামলাতে ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে সংকট কিছুটা প্রতিরোধ করা গেলেও তেলের দাম আকাশচুম্বীই থেকে যাবে। তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য সরবরাহ নয়, বরং মূল সংকট হবে চড়া দামের ধাক্কা। গবেষণা বলছে, তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি হু হু করে বাড়তে পারে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই এখন স্রেফ একটি সরু নৌপথ, অর্থাৎ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। আর এর বিকল্প খুবই কম। জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান পথটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হবে।