সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা পর কালো ধোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা পর কালো ধোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান অঞ্চলজুড়ে ‘নির্বিচার ও বেপরোয়াভাবে’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে।

বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালানো হচ্ছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সোমবার সকালে বলেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। এর জবাবে লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। শিয়া মতাবলম্বী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রধান মিত্রের ভূমিকায় রয়েছে।

হিজবুল্লাহ–নিয়ন্ত্রিত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর এবং লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৪৯ জন আহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। লেবাননের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৫০টি গ্রামের বাসিন্দাদের নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বলেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

ইসরায়েলের হামলার মুখে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং বৈরুতের দক্ষিণ দিকের উপশহর থেকে পালাচ্ছেন বাসিন্দা। এতে সোমবার সকালে ওই সড়কগুলোতে ব্যাপক ভিড় দেখা দেয়।

বৈরুতে ইসরায়েলের হামলার পর আগুন ও ধোঁয়ার কুন্ডলী দেখা যায়। লেবানন, ২ মার্চ

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, শনিবার থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর কোনো একক হামলায় এটাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও সামহা এবং কাতারের রাজধানী দোহায় বড় বড় বিস্ফোরণ ঘটছে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার সৌদি আরামকোয় ড্রোন হামলায় আগুন ধরার পর সেটি বন্ধ করে দিয়ে দেশটি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও থেকে নেওয়া এই স্থিরচিত্রে কুয়েতের আল জাহরায় আকাশ থেকে একটি জ্বলন্ত বিমান নিচে পড়তে দেখা যাচ্ছে। ২ মার্চ ২০২৬

কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে ভুল করে ছোড়া গোলায় তিন মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। ওই যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কাজে মোতায়েন ছিল। যুদ্ধবিমানগুলো থেকে ছয়জন ক্রুর সবাই নিরাপদে বের হয়ে আসতে পেরেছেন এবং তাঁরা সুস্থ আছেন বলে যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে।

সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি আর এ এফ আকরোতিরিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। সেখানে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার অবস্থান বদলে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সাইপ্রাসে দেশটির ঘাঁটিতে এই হামলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব ইতিমধ্যে পড়া শুরু করেছে। সোমবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পুঁজি বাজারগুলোতে দরপতনের চাপ তৈরি হয়েছে।

কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত, ২ মার্চ

সোমবার সকালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি মূল্য ৮২ ডলারে উঠেছে। এটা গত ১৪ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম। বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর আরও এক সদস্য নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে যুদ্ধে চার মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, যুদ্ধে আরও মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল রোববার বলেছেন, ইরানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে। অভিযানের পক্ষে যৌক্তিকতা তৈরি করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকা ইরানের শাসকগোষ্ঠী প্রতি আমেরিকানের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠবে। আমি আবারও রেভোল্যুশনারি গার্ড, ইরানি মিলিটারি পুলিশের প্রতি আপনাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে আহ্বান জানাচ্ছি। তাতে আপনারা পূর্ণ দায়মুক্তি পাবেন অন্যথায় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হবেন।’

ইরানের তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলার পর একটি স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠছে। ১ মার্চ ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফক্স নিউজকে বলেছেন যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির ৪৮ জন নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কী রকম সাফল্য সাফল্য পাচ্ছি তা কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না, এক হামলায় ৪৮ নেতা শেষ হয়ে গেছে।’

ট্রাম্প রোববার আটলান্টিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান এবং তিনি তাতে রাজি আছেন। তবে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি বলেছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করবে না।

রোববার রয়টার্স/ইপসোসের এক জনমত জরিপে বলা হয়েছে, মাত্র ২৭ শতাংশ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুকে সমর্থন করেছেন। অপর দিকে প্রায় অর্ধেক আমেরিকান–চারজন রিপাবলিকানদের মধ্যে একজনসহ মনে করেন, ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে অতি উৎসাহী।

যুদ্ধের কারণে বেসামরিক বিমান পরিবহন চলাচল ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ মানুষ আটকা পড়েছেন।