রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ দুই দেশের কর্মকর্তারা সেন্ট পিটার্সবার্গে বৈঠক করেন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ দুই দেশের কর্মকর্তারা সেন্ট পিটার্সবার্গে বৈঠক করেন

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা কি তাহলে এখন পর্দার আড়ালে চলছে

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আঞ্চলিক সহযোগীদের সঙ্গে একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া। তবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পরে করার জন্য স্থগিত রাখার কথা বলা হয়েছে। তিনটি দেশে ৭২ ঘণ্টার কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে এই পরিকল্পনার জন্য ব্যাপক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

গত সোমবার আরাগচি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সেন্ট পিটার্সবার্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর আগে তিনি দুই দিনে দুবার ইসলামাবাদ সফর করেন। মাঝখানে ওমানের মাসকটে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো আল–জাজিরাকে বলেছে, মাসকটের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মাসকটের আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য সমঝোতার রূপরেখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে পারমাণবিক ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা হয়নি। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার জন্য সেটিকে রেখে দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাবটি পাকিস্তানের কাছে জমা দিয়েছে। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই পক্ষের সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করে যাচ্ছে।

হোয়াইট হাউস ইরানের প্রস্তাবের বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেনি। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘গণমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আলোচনা করবে না’। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শুধু এমন চুক্তি করবে, যা মার্কিন জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং কখনোই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেবে না।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক আলোচনা পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে প্রস্তাব নিয়ে তিনি খুশি নন বলে জানিয়েছেন। গত রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইতিমধ্যেই জানে তাদের কী করতে হবে।

পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়া সফর ছাড়াও গত কয়েক দিনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতার, সৌদি আরব, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানি সরাসরি আরাগচির সঙ্গে কথা বলেছেন।

ট্রাম্প বলেন, তাদের (ইরান) পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না। তা না হলে বৈঠক করার কোনো কারণ নেই।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তেহরান চাইলে যোগাযোগ করতে পারে। আপনারা জানেন, টেলিফোন আছে। আমাদের ভালো, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে।’

সাম্প্রতিক এ কূটনৈতিক তৎপরতা সময়ের চাপের মধ্যেই এগোচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখতে হলে ট্রাম্পকে আগামী ১ মের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। এ প্রস্তাব কার্যকর করার জন্য ১৫ এপ্রিল সিনেটে চতুর্থবারের মতো প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। তবে প্রস্তাবটি পাস হয়নি।

রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এ পর্যন্ত ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে এলেও তাঁদের কয়েকজন বলেছেন, কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিন অভিযান চালানোর যে এখতিয়ার ট্রাম্পের আছে, তা আর বৃদ্ধি করার মতো সমর্থন তিনি পাবেন না।

কেন্দ্রে পাকিস্তান

পাকিস্তানে দুবারের সফরের প্রথম দফায় গত শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তিনি মাসকট সফর করেন এবং রোববার পাকিস্তানে ফিরে আবারও আসিম মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর মস্কোর উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

দেশ ছাড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ পালন করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পন্থা ও অতিরিক্ত দাবির’ কারণে আগের দফার আলোচনা কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।

ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা এখনো অনেক দূরের বিষয়। কারণ, ইরানের দাবি শুধু হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা পুরো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের দাবি করছে এবং সাম্প্রতিক হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলো এমন কিছু দিতে রাজি নয়।
দানিয়া থেফার, গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ বিষয়ে সোচ্চার।

ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত বার্তা সংস্থা ফারসের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করেছেন। এসব বার্তায় পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানের অনড় অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। বার্তা সংস্থাটি এটিকে ‘আঞ্চলিক পরিস্থিতি পরিষ্কার করার জন্য ইরানের একটি উদ্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব আইজাজ চৌধুরী মনে করেন, আলোচনা পরিচালনা করার ধরনটা উল্লেখ করার মতো। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি গোপনীয়তা রক্ষার এক প্রশংসনীয় নজির দেখেছি। এ ধরনের আলোচনা পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ ও পেশাদার পদ্ধতি।’

আঞ্চলিক সমর্থন বৃদ্ধির চেষ্টা

পাকিস্তান, ওমান ও রাশিয়া সফর ছাড়াও গত কয়েক দিনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতার, সৌদি আরব, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল–থানি সরাসরি আরাগচির সঙ্গে কথা বলেছেন। সমুদ্রপথ যেন ‘কোনো দর–কষাকষির হাতিয়ার বা চাপ প্রয়োগের কৌশল’ না হয়ে ওঠে, তা নিয়ে আরাগচিকে সতর্ক করেন তিনি।

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল–সৌদকে যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিস্থিতি জানানো হয়েছে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি কাতার ও ইরান দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেই কথা বলেছেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ নোয়েল বারো জোর দিয়ে বলেছেন, এ সংকটে ইউরোপ ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ রেখেছে।

মাসকটে আরাগচির সঙ্গে বৈঠকের পর ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি ‘নৌ চলাচলের স্থায়ী স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত সমাধান’ খোঁজার আহ্বান জানান।

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থেফার বলেন, ঘনঘন হওয়া এ ফোনালাপগুলো কোনো বড় কৌশলগত জোট পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়; বরং এটি সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত কূটনৈতিক যোগাযোগের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

থেফার আল–জাজিরাকে বলেন, ইরানের নেতৃত্ব সরাসরি কাতার বা সৌদি আরব সফর না করলেও টেলিফোনে যোগাযোগ হয়েছে। এতে বোঝা যায়, পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক স্বীকৃতি না দিলেও যোগাযোগ বজায় রাখার একটি আগ্রহ বা ইচ্ছা রয়েছে।

পাকিস্তানি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসলামাবাদ আবারও আনুষ্ঠানিক আলোচনা আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। তবে বাস্তব আলোচনা সম্ভবত জনসমক্ষে নয়; বরং গোপন পরিসরেই চলবে। কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছালে তবেই তা দৃশ্যমান হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আগে ইরান প্রতিদিন সৌদি আরব, কাতার ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছিল। এতে দেশগুলো ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তবে কাতার, ওমান ও সৌদি আরব কূটনৈতিক পথেই সমস্যা সমাধানের আগ্রহ দেখাচ্ছে। শর্ত হলো, ইরান তাদের ওপর আর হামলা চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

একই সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তাদের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। থেফার বলেন, আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হরমুজ প্রণালি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা।

ইরানের সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক রেজা আফজাল আল–জাজিরাকে বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান বদলেছে। যেসব দেশ তখন পারমাণবিক চুক্তির বিরোধিতা করেছিল, তারা এখন বুঝতে পারছে, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি তাদের স্বার্থেই কাজ করে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় ইরানের সামরিক পদক্ষেপগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতার জন্য কতটা মাশুল গুনতে হয়।

পাকিস্তানি সাবেক কূটনীতিক আইজাজ চৌধুরী মনে করেন, বর্তমান আলোচনাগুলো কোনো একক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই।

আইজাজ বলেন, ‘এটি শুধু পারমাণবিক ইস্যু নয়, মূলত এ যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, এরপর কী ঘটবে এবং আমরা কেমন নিরাপত্তাকাঠামো দেখতে পাব—এসব নিয়েই আলোচনা চলছে। সবাই এখন এসব বিষয় নিয়েই কথা বলছে।’

মাসকটে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি

রাশিয়ার নীরব উপস্থিতি

রাশিয়ায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি আগেই নিশ্চিত করেছেন, আব্বাস আরাগচির মস্কো সফরে ‘সাম্প্রতিক আলোচনার অবস্থা, যুদ্ধবিরতি ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন’ নিয়ে আলোচনা হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। জালালি একে ‘বিশ্বের স্বৈরাচারী শক্তিগুলোর’ বিরুদ্ধে ইরান ও রাশিয়াকে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইসলামাবাদের ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক তৈমুর খান বলেন, মূলত তিনটি ক্ষেত্রে রাশিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে ইরান। এগুলো হলো তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা ও আগের পারমাণবিক চুক্তিতে প্রযুক্তিগত ভূমিকা।

তৈমুর খান আল–জাজিরাকে বলেন, মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে পারবে না এবং সরাসরি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার বিকল্পও হতে পারবে না। মূলত কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী, প্রযুক্তিগত সহায়তা দানকারী ও ভূরাজনৈতিক পাল্টা শক্তি হিসেবে তাদের ভূমিকা রয়েছে।

তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক জাভেদ হেরান নিয়া বলেন, মস্কো সফর বৃহত্তর কূটনীতির পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট ইস্যুও সমাধান করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হেরান নিয়ার মতে, এ সফর সম্ভবত ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত ও তেহরান–মস্কো সামরিক সহযোগিতা–সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।

রাশিয়া ইতিমধ্যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

পারমাণবিক চুক্তি থেকে পাওয়া শিক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, আব্বাস আরাগচির এ কূটনৈতিক উদ্যোগের পেছনে একটি কাঠামোগত শিক্ষা কাজ করছে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে ইরান এ শিক্ষা নিয়েছে।

২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প যখন পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন, তখন ইরান আঞ্চলিক সমর্থন হারিয়ে ফেলেছিল। ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার মতো কোনো শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারীও ছিল না।

গবেষক তৈমুর খান মনে করেন, তেহরান সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজ ইসলামাবাদের সভাপতি জওহর সালিমের মতে, ইরানের এ হিসাব-নিকাশ কৌশলগতও।

সালিম বলেন, আদর্শগতভাবে ইরান এমন কোনো চুক্তি চায় না, যা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী চক্রের কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

সালিমের মতে, ইরান দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে।

তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক জাভেদ হেরান নিয়ার মতে, আগের পারমাণবিক চুক্তির সময়ের তুলনায় এখন উপসাগরীয় আরব দেশগুলো কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

হেরান নিয়ার আল–জাজিরাকে বলেন, জেসিপিওএ (২০১৫–এর পারমাণবিক চুক্তি) চূড়ান্ত হওয়ার সময়ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল।

মেহরান কামরাভা বলেন, বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান-উপসাগরীয় সম্পর্ক উন্নয়নের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

কামরাভা বলেন, এটি এক দিনের বা একক কোনো সংকটের প্রতিক্রিয়া নয়; বরং ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ।

আব্বাস আরাগচিকে স্বাগত জানাচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ

ব্যবধানগুলো কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কূটনৈতিক উদ্যোগ কেবল তখনই কার্যকর হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো চুক্তিতে রাজি হয়।

ট্রাম্প শনিবার তাঁর দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের ইসলামাবাদ সফর বাতিল করেন। তিনি বলেন, ইরান ‘অনেক কিছু প্রস্তাব করেছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়’।

ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইস্যুতে চীন আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ১৪–১৫ মে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের কথা রয়েছে।

দানিয়া থেফার মনে করেন, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা এখনো অনেক দূরের বিষয়। কারণ, ইরানের দাবি শুধু হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা পুরো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের দাবি করছে এবং সাম্প্রতিক হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলো এমন কিছু দিতে রাজি নয়।

ইরানি সাংবাদিক ও বিশ্লেষক রেজা আফজাল বলেন, হরমুজ ইস্যুতে ইরানের অভ্যন্তরীণ জনমতও প্রায় উপেক্ষিত হয়। তাঁর মতে, দেশটির জনগণের বড় অংশ কোনো বাস্তব ছাড় ছাড়া হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন যদি কোনো সমঝোতায় না আসে, তাহলে তেহরান হরমুজকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করবে।

বর্তমানে একাধিক সময়সীমা একসঙ্গে এসে পড়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ১ মের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার সময়সীমা, ট্রাম্পের চীন সফর ও আসন্ন হজ মৌসুম।

মে মাসের শেষ দিকে সৌদি আরবে লাখো হাজির আগমন ঘটবে। ফলে ওই সময় সৌদি আরবের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা চাপের মুখে পড়বে। এতে একটি বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হলে তা বিশেষভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। কারণ, দেশটি একদিকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী, অন্যদিকে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর রক্ষক।

পাকিস্তানি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, ইসলামাবাদ আবারও আনুষ্ঠানিক আলোচনা আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। তবে বাস্তব আলোচনা সম্ভবত জনসমক্ষে নয়; বরং গোপন পরিসরেই চলবে। কোনো চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছালে তবেই তা দৃশ্যমান হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত জওহর সালিমের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন কোণঠাসা অবস্থায় আছে এবং তাদের খুব সতর্কভাবে কূটনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।