
না, আজিজা আহমেদের কোনো পরিকল্পনা নেই এই ঈদে। না কোনো খাবারদাবারের আয়োজন, না সন্তানদের জন্য কোনো উপহার কেনা। যুদ্ধের মধ্যে লেবাননে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে রং হারিয়েছে উৎসব। ‘এই ঈদুল ফিতরে উদ্যাপনের কিছু নেই,’ বলছিলেন তিনি।
লেবাননের রাজধানী বৈরুত থেকে দুবাই, মানামা, জেরুজালেম—কোথাও ঈদের চেনা আনন্দ নেই। যুদ্ধের মধ্যে লাখো মুসলমানের পবিত্র রমজান মাসটি কেটেছে কষ্টে। আজ শুক্রবার সেখানে ঈদ এসেছে, কিন্তু আনন্দ আসেনি।
৩৯ বছর বয়সী আজিজা আহমেদ তাঁর স্বামী ও তিন ছেলেকে নিয়ে বৈরুতের পুরোনো ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। ওই অ্যাপার্টমেন্টে বর্তমানে ১২ জন থাকছেন।
আজিজা আহমেদ বলেন, ‘এখানে ঈদ আনন্দের উপলক্ষ নয়। আমাদের কাছে কোনো অর্থকড়ি নেই। যারা বাস্তচ্যুত, তারা তো ঘরেই ফিরতে পারছে না।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে থেকে লেবাননে অর্থনৈতিক সংকট চলছিল, আর এখন স্থানীয় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া।
ঈদের আগে আজিজা তাঁর বাড়ির সামনে একটি ছোট পেস্ট্রি স্টল বসিয়েছিলেন, যাতে তাঁর স্বামীর গাড়ি ধোয়ার কাজের মজুরির সঙ্গে সাংসারিক আয়ে বাড়তি অর্থ যোগ হয়।
তবে এই খাবারের সবই বিক্রির জন্য। ‘আমরা একটাও খাব না,’ বলেন আজিজা।
পুরো পরিবার এই পেস্ট্রি তৈরিতে ব্যস্ত। ময়দা মাখানো, পেস্তাবাদাম কাটায় ব্যস্ত সবাই।
তার মধ্যে থাকা ১১ বছর বয়সী ইয়াসমিন বলল, ‘আমরা বাইরে খেলতে যাব না। সবাই ভয় পাচ্ছে, ইসরায়েল হামলা করছে, তাই আমরা বাড়িতেই আছি।’
আতঙ্ক সর্বত্র
বোমা হামলার ভয় ঈদের আনন্দ ছাপিয়ে গেছে বৈরুতের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও। এই অঞ্চলে যে স্থানগুলোকে নিরাপদ ভাবা হতো, সেগুলোও এখন অনিরাপদ হয়ে উঠেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলায়।
এই ঈদুল ফিতরে উদ্যাপনের কিছু নেই।আজিজা আহমেদ, লেবাননের বাসিন্দা
কুয়েতে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন হচ্ছে আজ। তবে কর্তৃপক্ষ নাটক, কনসার্ট ও বিয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে বড় জমায়েত সীমিত করা যায়।
কুয়েতে কাজ করা ৪১ বছর বয়সী মিসরীয় আলী ইব্রাহিম বলেন, ‘ঈদের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনতে লোকজনও দোকানপাটে আগের তুলনায় কম যাচ্ছ।’
কাতারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রকাশ্য সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ঈদুল ফিতরে ময়দানে নামাজ বন্ধ রেখেছে। শুধু মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে ঈদের জামাত।
দুবাইতে প্রায় তিন দশক বসবাসরত ৫৩ বছর বয়সী জুহি ইয়াসমিন খান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আমরা অনেকেই ঘরেই ছোট পরিসরে ঈদ উদ্যাপন করতে চাই।’
বর্তমান পরিস্থিতি দেখে, আমরা অনেকেই ঘরেই ছোট পরিসরে ঈদ উদ্যাপন করতে চাই।জুহি ইয়াসমিন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দা
জুহি ইয়াসমিন খান তাঁর মা, বোন ও ছেলের সঙ্গে ঈদ কাটাবেন। এর মধ্য দিয়ে ঈদের আনন্দ ধরে রাখার পরিকল্পনা তাঁর।
তবু আশা
ফিলিস্তিনের পূর্ব জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদসহ অন্য ধর্মীয় স্থানগুলো ইসরায়েল বন্ধ করে রাখায় এই বছর সেখানকার মুসলমানদের কাছে পবিত্র রমজান অসম্পূর্ণ ঠেকছে।
যুদ্ধ আমাদের ঈদ উদ্যাপন বন্ধ করতে পারবে না।মরিয়াম আবদুল্লাহ, বাহরাইনের বাসিন্দা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক যুবক বলেন, ‘আমরা আল-আকসা মসজিদ থেকে বঞ্চিত, এর জন্য আমাদের হৃদয়ে একধরনের যন্ত্রণা আছে।’
এই বছর ঈদে সেখানে লণ্ঠনের আলোয় বাড়িগুলো সাজেনি। রাস্তাগুলো সুনসান।
বাহরাইনের বাসিন্দারা প্রতিদিন একাধিকবার সাইরেন শুনছেন, যা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কা দেখলে সতর্ক করার জন্য বাজানো হয়।
তার মধ্যেই গতকাল কেউ কেউ ঈদের কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলেন। তাঁদের একজন হেসা আহমেদ বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে শপিংয়ে গিয়েছিলাম। আমরা নতুন জামাকাপড় কিনেছি এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
মানামার একটি রূপচর্চার দোকানে পাঁচ বছর বয়সী সারা ঈদের জন্য হাতে মেহেদি রাঙাতে সেখানে অপেক্ষা করছিল। তার মা মরিয়াম আবদুল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের ঈদ উদ্যাপন বন্ধ করতে পারবে না।’
এবার পরিবারের মধ্যে ঈদ আয়োজন সীমিত রাখলেও মরিয়াম আশা প্রকাশ করেন, দমবন্ধ এই পরিস্থিতির অবশ্যই অবসান হবে। ঈদ উৎসবের চেনা রং আবার ফিরবে।