
ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেছেন, মাঝেমধ্যে দ্বিমত হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতির খবরকে নাকচ করে বলেছেন, দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ সাময়িক। এ মতবিরোধ সাধারণত কৌশলগত বিষয়ে হয়ে থাকে।
ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সচল রাখার ওয়াশিংটনের চেষ্টার মধ্যেই নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনে এ আলাপ হয়েছিল। লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে আলাপে কড়া ভাষা ব্যবহারের কথা ট্রাম্প স্বীকার করার পরই নেতানিয়াহু এ মন্তব্য করলেন।
গত বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, মাঝেমধ্যে দ্বিমত হলেও তাঁদের সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা সকালে দ্বিমত পোষণ করতে পারি এবং বিকেলের মধ্যেই ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ঘনিষ্ঠ মিত্ররা সব সময় সব বিষয়ে একমত হবেন, এমন কোনো কথা নেই।’
ইসরায়েলের জেরুজালেমে সিএনবিসির সারা আইজেনের সঙ্গে বিস্তৃত সাক্ষাৎকার দেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ সময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেন এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে ইসরায়েলের প্রশংসা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই লেবাননে ইসরায়েলের ক্রমাগত সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে একটি ফোনকলে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে গালিগালাজ করেছিলেন—এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপরই এ সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো।
ট্রাম্প শুরুতে এ যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে বলে ধারণা করলেও তা এখন চার মাসে পড়েছে।
এ সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও তেল সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের কাছাকাছি ওঠানামা করছে।
উগ্রবাদী ইহুদি নেতা নেতানিয়াহু বলেন, যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ‘কৌশলগত দ্বিমত’ থাকতে পারে। তবে তারা ‘অনেক বিষয়ে একমত’।
নেতানিয়াহু ইরানকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই অস্তিত্বের সংকট বা হুমকি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার জবাবে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু কিছু পশ্চিমা টেলিভিশন চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা করেন।
উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু দাবি করেন, তিনি ইরানে সরকার পরিবর্তনের আশা করছেন। কারণ, বর্তমান নেতৃত্ব ‘ভীষণভাবে’ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এটি ঠিক কবে ঘটবে, সে বিষয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেননি।
দম্ভোক্তি করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এ ধরনের শাসনব্যবস্থা কখন ভেঙে পড়বে, তা আপনি ঠিকঠাক অনুমান করতে পারবেন না। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আপনারা তা অনুমান করতে পারেননি। রোমানিয়া কিংবা বার্লিন প্রাচীরের পতনের ক্ষেত্রে কেউ তা আগে থেকে বলতে পারেনি, কিন্তু তা ঘটেছিল। কেন? কারণ, ভেতরে-ভেতরে ফাটল তৈরি হচ্ছিল।’
আধুনিক যুগের এই বর্বর নেতা দাবি করেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে ইরানের ভেতরে বিশাল ফাটল রয়েছে। এটি কখন ধসে পড়বে, তা আপনি আগে থেকে বলতে পারবেন না।’
মানবতাবিরোধী অপরাধে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত এই যুদ্ধবাজ নেতা বলেন, ‘আমি মনে করি, এই সরকারকে হঠাতে আমাদের ইরানের জনগণকে সাহায্য করতে হবে। আমরা এই অবস্থান বদলায়নি। তবে এটি ঠিক, আমাদের নির্ধারিত সময়েই ঘটবে এমনটা নয়।’
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ‘প্রতি দুই দিনে একবার’ কথা বলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘ট্রাম্প ও আমার সাধারণ কিছু লক্ষ্য রয়েছে...আমরা সেগুলো অর্জন করতে চাই।’
তবে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে তিনি কী আশা করেন, জানতে চাইলে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু স্বীকার করেন, ‘যুদ্ধ কীভাবে শেষ হওয়া উচিত, তা এখনো একটি অমীমাংসিত বিষয়।’
নেতানিয়াহু বললেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ‘কৌশলগত দ্বিমত’ থাকলেও ‘প্রধান প্রধান বিষয়ে তাঁরা একমত’। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন এবং তা দিয়ে ইসরায়েলকে হুমকি দেওয়া থেকে বিরত রাখা।
কট্টর এই নেতা বলেন, ‘সবচেয়ে সুখী পরিবারগুলোতে যেমনটা হয়ে থাকে, তেমনি মাঝেমধ্যে আমাদের মধ্যেও এই কৌশলগত মতবিরোধ দেখা দেয়। তবে আমরা সব সময় এগুলো সমাধানের পথ খুঁজে নিই এবং আমরা তা করি দারুণ বন্ধু হিসেবে।’
নেতানিয়াহু বলেন, যেসব পক্ষ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল, তারা ইতিমধ্যেই ‘বিকল্প রুট বা পথ তৈরি করছে’। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত বন্ধ থাকায় যে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা এই বিকল্প পথ দিয়ে পূরণ করা হবে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন এটাই ঘটছে। এমন নয় যে এটি ঘটবে, বরং এখনই এটি ঘটছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পার হতো। তবে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, অন্যান্য রুট দিয়ে ‘এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব’।
গাজা ও লেবাননে নির্বিচার ও নৃশংস ইসরায়েলি হামলার সমালোচনা করা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর মতো ইউরোপীয় নেতাদের কড়া সমালোচনা করেছেন যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের কট্টরপন্থী ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউরোপীয় নেতারা যেভাবে তাঁদের দেশের কট্টরপন্থী ইসলামি সংখ্যালঘু মানুষের তোষামোদ করেন, তা লজ্জাকর।
এই উগ্র ইহুদিবাদী যুদ্ধবাজ দাবি করেন, ‘তাঁরা (ইউরোপীয় নেতারা) ভালো করেই জানেন, আমরা তাঁদেরও রক্ষা করছি। কিন্তু এই “বর্বরদের” হাত থেকে আমাদের সভ্যতাকে বাঁচানোর জন্য সঠিক পথে দাঁড়ানোর মতো সাহস তাদের নেই।’