
ইরানের বিরুদ্ধে অব্যাহত হুমকির পর কিছুটা সুর নরম করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে এমন সময়ে তিনি এ কথা বললেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এদিকে যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে এসেও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। ইসরায়েলের বেনগুরিয়েন বিমানবন্দরে জ্বালানি ট্যাংকার ও রিফুয়েলিং উড়োজাহাজে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে মধ্য ইসরায়েলেও। এ ছাড়া ইরানের আকাশসীমায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নিশানা করা হয়েছিল বলে স্বীকার করেছে তেল আবিব।
চলমান যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে বারবার মিশ্র বার্তা দিয়ে আসছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারের কাছাকাছি গেলে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। যদিও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ‘সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত’ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন ট্রাম্প। সম্প্রতি ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলায় চালায় ইরান। এতে আবার প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১৫ ডলারের কাছে গিয়ে ঠেকে।
এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে স্থানীয় সময় শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কোনো যুদ্ধবিরতি করতে চাই না। যখন আপনি আক্ষরিক অর্থেই প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছেন, তখন আপনি যুদ্ধবিরতি চাইবেন না।’
মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থ হয়ে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ বিভিন্ন বিকল্প দেখছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর মধ্যে স্থল অভিযান চালিয়ে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়টিও তাঁর বিবেচনায় রয়েছে। তবে এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন তিনি। এ নিয়ে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই বিরোধিতা রয়েছে।
কিন্তু গভীর রাতে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ইরানের সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের মহান সামরিক চেষ্টা গুটিয়ে নেওয়ার কথা আমরা বিবেচনা করছি।’
এমন এক সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ মন্তব্য করলেন, যখন ওই অঞ্চলে স্থল অভিযানে পারদর্শী আরও তিনটি মার্কিন উভচর জাহাজ এবং প্রায় আড়াই হাজার মেরিন সেনা পাঠানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের খারগ দ্বীপ দখল বা অবরোধ করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর উদ্দেশ্য হলো তেহরানকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে বাধ্য করা।
এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার তীব্রতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে’ বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মূল্যায়ন সভায় তিনি বলেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং এই অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের ওপর থেকে প্রতিটি নিরাপত্তা হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত ‘ইরানি সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যেতে, কমান্ডারদের নির্মূল করতে এবং তাদের কৌশলগত সক্ষমতা নস্যাৎ করতে ইসরায়েল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।’
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এমন হুমকির মধ্যেই ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় দ্বিতীয়বারের মতো হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থাকে (আইএইএ) জানিয়েছে ইরান। এ ছাড়া পারস্য উপসাগরে বেসামরিক কার্গো জাহাজ এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম হরমোজগান প্রদেশের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলেছে, এ হামলায় ১৬টি ব্যক্তিমালিকানাধীন কার্গো জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ইরানের আট হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩০টি যুদ্ধজাহাজকে নিশানা করা হয়েছে।
এদিকে এসব হামলার পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরান। এই প্রথম ভারত মহাসাগরে ডিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি নিশানা করে দুটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে দেশটি। ইরান থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। অথচ ইরান এত দিন দাবি করে আসছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটার।
ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত। হামলার আশঙ্কায় বাহরাইনে সাইরেনের শব্দ শোনা গেছে। কয়েক ডজন ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি আরবও। ইরাকে মার্কিন ঘাঁটির লজিস্টিক সাপোর্ট কেন্দ্রে ড্রোন হামলা হয়েছে। এ ছাড়া ইরান-সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ সশস্ত্র গোষ্ঠীর রকেট হামলায় ইসরায়েলে দুটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমাদের অবস্থান হলো, আমরা কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করব না। কারণ, আমরা গত বছরের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি চাই না। যুদ্ধ অবশ্যই সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে বন্ধ হতে হবে। এই পরিস্থিতির আর পুনরাবৃত্তি হবে না বলে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা থাকতে হবে।আব্বাস আরাগচি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
অব্যাহত হামলা এবং যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের নতুন চিন্তাভাবনার মধ্যেই নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জাপানের কিয়োডো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমাদের বার্তা হলো, এই যুদ্ধ আমাদের নয়। এটি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হলো, আমরা কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করব না। কারণ, আমরা গত বছরের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি চাই না। যুদ্ধ অবশ্যই সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে বন্ধ হতে হবে। এই পরিস্থিতির আর পুনরাবৃত্তি হবে না বলে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা থাকতে হবে।’
ইরানের পাশে আছে রাশিয়া: পুতিন
এদিকে ইরানের নেতাদের নওরোজ বা ফারসি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে দেওয়া এক বার্তায় শনিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, একনিষ্ঠ বন্ধু ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে তেহরানের পাশে রয়েছে মস্কো। ক্রেমলিনের ভাষ্যমতে, ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের জনগণকে এই কঠোর পরীক্ষা সসম্মানে কাটিয়ে ওঠার শুভকামনা জানিয়েছেন।
ক্রেমলিন জানায়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক গভীর অতল গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে এবং একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট তৈরি করেছে। পুতিন একই সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে ‘নৃশংস’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের চুক্তি রয়েছে। তবে এর প্রকাশিত নথিপত্রে কোনো ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা’ নেই। এ ছাড়া রাশিয়া বারবার বলে আসছে, পারমাণবিক বোমা তৈরি করুক, তা চায় না ইরান।
ইরানি তেলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল
জ্বালানি তেলের দামে ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট শুক্রবার জানান, ট্রাম্প প্রশাসন সমুদ্রে থাকা ইরানি তেল কেনার ওপর ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এ ঘোষণার পর ভারতসহ এশিয়ার অন্য দেশগুলো আবারও ইরানি তেল কেনার পরিকল্পনা করছে। ব্যবসায়ীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
ভারতের তিনটি রিফাইনারি (তেল শোধনাগার) সূত্র জানিয়েছে, তারা ইরানি তেল কিনতে প্রস্তুত এবং এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা ও পেমেন্ট পদ্ধতির মতো বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে স্পষ্ট বার্তার অপেক্ষায় রয়েছে। শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সমুদ্রের বিভিন্ন প্রান্তে জাহাজে প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল রয়েছে। অন্যদিকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি আসপেক্টস ১৯ মার্চ এই তেলের পরিমাণ ১৩-১৪ কোটি ব্যারেল বলে প্রাক্কলন করেছিল।
মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থ হয়ে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ বিভিন্ন বিকল্প দেখছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর মধ্যে স্থল অভিযান চালিয়ে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়টিও তাঁর বিবেচনায় রয়েছে। তবে এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন তিনি। এ নিয়ে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেই বিরোধিতা রয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক নেভি সিল কর্মকর্তা ও উইসকনসিন থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান সদস্য ডেরিক ভ্যান ওরডেন সিএনএনকে বলেন, তিনি প্রশাসনকে বিশেষভাবে ইরানে স্থলসেনা না পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
টেনেসি থেকে নির্বাচিত টিম বারচেটও একই সুরে বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের যত দ্রুত সম্ভব সরে আসার কৌশল (এক্সিট স্ট্র্যাটেজি) খুঁজে বের করা দরকার। আমি কোনোভাবেই সেখানে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েন চাই না।’