ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালির জাহাজ, ১৫ জুন ২০২৬
ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালির জাহাজ, ১৫ জুন ২০২৬

চুক্তির পর হরমুজ পার হলো সৌদির তিনটি সুপারট্যাংকার, লেবাননে হামলা ঘিরে দুশ্চিন্তা

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তি সইয়ের কয়েক ঘণ্টা পরই বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে তিনটি সৌদি সুপারট্যাংকার। এসব ট্যাংকারে ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ছিল।

তবে লেবাননে সংঘাতের জেরে এরই মধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে বৃহস্পতিবার সকালেও নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর যুদ্ধকালীন মিত্রের (ইসরায়েল) হামলা বন্ধ করতে তিনি কতটুকু কঠোর হবেন, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে।

যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে বুধবার একটি ‘সমঝোতা স্মারকে’ সই করেন ট্রাম্প। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে সই করেন। ফলে প্রত্যাশিত সময়ের দুই দিন আগেই চুক্তিটি কার্যকর হয়। চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, প্রণালিটি দিয়ে যান চলাচল যুদ্ধ–পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরতে এখনো সময় লাগবে। কারণ, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং মাইন পরিষ্কারের কাজ এখনো বাকি। তবে এর মধ্যেই চুক্তির তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

আগে যেসব জাহাজ অবস্থান গোপন রাখতে ট্রান্সপন্ডার (একধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগ যন্ত্র) বন্ধ রাখত, তারা এখন নিজেদের অবস্থান সম্প্রচার করছে। প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজগুলো এখন প্রস্তুত।

আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম আরও ২ শতাংশ কমেছে। এতে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৭৮ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এটিই তেলের সর্বনিম্ন দাম।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের একটি আলোচনার সময়সীমা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন।

লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের স্পষ্ট আহ্বান চুক্তিতে

এই শান্তি আলোচনা থেকে ইসরায়েলকে বাদ দেওয়া হয়েছে। গত মার্চে লেবাননে অভিযান শুরু করে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের দমনের নামে দক্ষিণ লেবাননের বিশাল একটি এলাকা দখল করে রেখেছে দেশটি। ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছিল হিজবুল্লাহও।

ইরান শুরু থেকেই বলে আসছিল, যেকোনো শান্তিচুক্তির আওতায় লেবাননকেও রাখতে হবে। ট্রাম্পের সই করা চুক্তিতে লেবানন যুদ্ধের ‘স্থায়ী সমাপ্তি’ টানার সুস্পষ্ট আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দেশটির ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এটিকে ইরানকে দেওয়া একটি বড় ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শান্তি প্রচেষ্টায় সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি লেবানন। সম্প্রতি সেখানে মিত্রদেশ ইসরায়েলের অভিযানের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের নিশানা করতে গিয়ে ইসরায়েল অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভবনগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।

চুক্তি নিয়ে আলোচনায় ট্রাম্প যে সিদ্ধান্তই নেন না কেন, লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে দেশটি। সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের দখলে থাকা দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিস্তৃত এলাকা দেখানো হয়েছে। এই এলাকাটিকে তারা ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ বেষ্টনী হিসেবে বর্ণনা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ ইসরায়েলি দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলি সেনা মোতায়েন রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর–কষাকষি করছে ইসরায়েল।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলা এই আলোচনাকে ‘একরোখা’ বলে বর্ণনা করেছেন ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ইসরায়েল কোনোভাবেই পিছু হটবে না। তবে অন্য কর্মকর্তা জানান, আলোচনার ফল নির্ভর করছে ট্রাম্পের ওপর। ট্রাম্প যদি পরিণতির হুমকি দিয়ে ইসরায়েলকে ‘বাধ্য করার সিদ্ধান্ত’ নেন, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প প্রথমে চুক্তি হওয়ার ঘোষণা দেন। তখন লেবাননে লড়াই কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে তা আবার বেড়েছে। এমনকি ট্রাম্প চুক্তি সই করার পর বৃহস্পতিবার সকালেও এই সংঘাত অব্যাহত ছিল।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননের কাফারতেবনিত ও জেবদাইন শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া রাজধানী বৈরুত ও এর দক্ষিণ দিকের শহরতলির আকাশে ইসরায়েলি ড্রোনের নিচ দিয়ে ওড়ার শব্দ শুনেছেন রয়টার্সের সাংবাদিকেরা।