
ইরানের খারগ দ্বীপ। এখানে পারস্য উপসাগরের তপ্ত রোদের নিচে সমুদ্রতলের পাইপলাইন দিয়ে বয়ে চলা লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের শোঁ শোঁ শব্দ প্রাচীন প্রবালপাথরেও যেন কম্পন ধরায়।
বিখ্যাত ইরানি লেখক জালাল আল-এ-আহমদ একসময় এই নির্জন উপকূলে দাঁড়িয়ে দ্বীপটির নাম দিয়েছিলেন ‘পারস্য উপসাগরের নিঃসঙ্গ মুক্তা’।
বুশেহর প্রদেশের ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র প্রবালদ্বীপ ইরানিদের কাছে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ নামে পরিচিত। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কঠোর পাহারায় থাকা এই দ্বীপে কেবল বিশেষ অনুমতি পাওয়া ব্যক্তিরাই যেতে পারেন।
তবে ইস্পাতের বেড়া আর প্রহরীদের নজরদারির বাইরে এখানে লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার বছরের মানব ইতিহাস, যা এখন ইরানের আধুনিক জ্বালানি সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার।
আজ শনিবার ভোরে এই খারগ দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তাঁর দেশের বিমানবাহিনী দ্বীপটির সামরিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেছে।
তবে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ভদ্রতার খাতিরে আমি দ্বীপটির জ্বালানি তেল অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে আমি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।’
বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়; বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এখান থেকে বিদেশে যায়।
বুশেহর বন্দর থেকে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়। বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এখান থেকে বিদেশে যায়।
দ্বীপটির চারপাশের গভীর পানি জ্বালানি তেলের বিশাল জাহাজগুলো নোঙর করার জন্য এক প্রাকৃতিক আশীর্বাদ। এখান থেকেই প্রধানত এশিয়ার বাজারে, বিশেষ করে চীনে তেল রপ্তানি করা হয়। ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতে, তিনটি প্রধান তেলক্ষেত্র—আবোজার, ফোরুজান ও দোরুদ থেকে তেল এখানে আসে এবং প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এই দ্বীপের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন দুটি বিশাল ট্যাংক সংস্কারের মাধ্যমে এর ধারণক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের দৈনিক রপ্তানি ১৬ লাখ ব্যারেলের আশপাশে হলেও এই টার্মিনালের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এই দ্বীপের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন দুটি বিশাল ট্যাংক সংস্কারের মাধ্যমে এর ধারণক্ষমতা আরও ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানো হয়েছে।
তেল আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই কৌশলগত কারণে এই দ্বীপ ছিল দিগ্বিজয়ীদের লক্ষ্য। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সময়ের কিছু ঐতিহাসিক যোগসূত্র থাকলেও প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড বলছে, এই দ্বীপের ইতিহাস স্বতন্ত্র। পর্তুগিজরা প্রথমে এটি দখল করে, পরে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে দুর্গ তৈরি করে বাণিজ্য শুরু করে। তবে ১৭৬৬ সালে স্থানীয় বীর মির মুহান্না ডাচদের বিতাড়িত করেন।
বিংশ শতাব্দীতে রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে এই দ্বীপকে রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ১৯৫৮ সালের পর এর আধুনিক যুগের সূচনা হয় এবং ১৯৬০ সালে জ্বালানি তেলের প্রথম বড় চালান এখান থেকে যাত্রা করে।
বিংশ শতাব্দীতে রেজা শাহ পাহলভির শাসনামলে এই দ্বীপকে রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ১৯৫৮ সালের পর এর আধুনিক যুগের সূচনা হয় এবং ১৯৬০ সালে প্রথম বড় চালান এখান থেকে যাত্রা করে।
আধুনিক শিল্পায়নের আড়ালে এই দ্বীপে লুকিয়ে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। এখানে এলানাইট, একিমেনিড এবং সাসানিদ আমলের মানববসতির প্রমাণ পাওয়া যায়। সপ্তম হিজরি শতকের ‘মির মোহাম্মদ মাজার’ এবং প্রাগৈতিহাসিক আমলের ‘মির আরাম মাজার’ দ্বীপটির অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য নিদর্শন এই দ্বীপ। এখানকার প্রাচীন কবরস্থানে একই সঙ্গে জরথুস্ত্রবাদ, খ্রিষ্টান এবং সাসানিদ আমলের সমাধি দেখা যায়। এ ছাড়া এখানে রয়েছে ১৭৪৭ সালের ডাচ দুর্গ, ডাচ বাগান এবং ঐতিহাসিক একিমেনিড শিলালিপি; যেখানে ‘পারস্য উপসাগর’ নামটি স্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে এই দ্বীপ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছিল, যা পরে ইরান পুনর্নির্মাণ করে।