
ইসরায়েলকে তাদের কাছে আটকে থাকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) করের অর্থের একটি অংশ ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অর্থ যুদ্ধপরবর্তী গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হবে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এখনো ইসরায়েলকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়নি। এ বিষয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র এ কথা বলেছে।
অন্য দুটি ফিলিস্তিনি সূত্র এই আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে। তাদের মতে, করের অর্থের একটি অংশ গাজার মার্কিন-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারকে দেওয়া হবে। বাকি তহবিল পাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ)। তবে এ জন্য তাদের কিছু সংস্কার করতে হবে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েল তাদের প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের কর আটকে রেখেছে।
ফিলিস্তিনিদের নিজেদের করের অর্থই ট্রাম্পের গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অথচ এ পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। এতে পশ্চিমা সমর্থিত পিএ আরও কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে। এমনিতেই ইসরায়েল করের অর্থ আটকে রাখায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে তীব্র আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে।
পিএ পশ্চিম তীরে সীমিত স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। তবে ২০০৭ সালে হামাসের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত গৃহযুদ্ধের পর পিএ গাজা থেকে উৎখাত হয়। এর পর থেকে সেখানে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি যুদ্ধে গাজা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি বর্তমানে থমকে আছে। হামাস অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েলি বাহিনী অনবরত হামলা চালাচ্ছে। এসব কারণে গত অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ব্যাহত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের একটি ব্যবস্থার আওতায় পিএর হয়ে আমদানি পণ্যের ওপর কর আদায় করে ইসরায়েল। পরে সেই অর্থ পিএর কাছে হস্তান্তর করার কথা। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও বিভিন্ন জনসেবা খাতে এই অর্থ ব্যবহার করে পিএ।
‘ব্যাংকে পড়ে থাকা অর্থ কোনো কাজে আসে না’
ফিলিস্তিনিদের করের অর্থ ব্যবহারে ইসরায়েলের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ।
এই পর্ষদের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্পের গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনায় সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই নিজেদের সম্পদ ও অর্থ কাজে লাগানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় সাত হাজার কোটি ডলার খরচ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এর মধ্যে পিএ এবং ইসরায়েলও রয়েছে। ব্যাংকে পড়ে থাকা অর্থ প্রেসিডেন্টের ২০ দফা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো কাজে আসছে না।’
ব্যাংকে পড়ে থাকা অর্থ বলতে এই কর্মকর্তা মূলত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সেই করের অর্থকে বুঝিয়েছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল আটকে রেখেছে। ইসরায়েলের কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনিদের পরিবারগুলোকে দেওয়া ভাতা নিয়ে বিরোধের জেরে এই অর্থ আটকে রাখা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের একটি ব্যবস্থার আওতায় পিএর হয়ে আমদানি পণ্যের ওপর কর আদায় করে ইসরায়েল। পরে সেই অর্থ পিএর কাছে হস্তান্তর করার কথা। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও বিভিন্ন জনসেবা খাতে এই অর্থ ব্যবহার করে পিএ।
তবে ওয়াশিংটন ঠিক কী পরিমাণ অর্থ ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদে দিতে ইসরায়েলকে অনুরোধ করতে পারে, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি সূত্রগুলো।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, ইসরায়েল সরকার বা পিএ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে পিএর ওপর চাপ দিয়ে আসছে, যাতে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দী এবং ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে দেওয়া ভাতা বন্ধ করা হয়। তাদের দাবি, এই অর্থ সহিংসতাকে উৎসাহিত করে।
তবে ফিলিস্তিনিদের কাছে এই ভাতা সামাজিক সহায়তার অংশ। তারা বন্দীদের জাতীয় বীর হিসেবেই দেখে।
মার্কিন চাপের মুখে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিএ জানায়, তারা ভাতা দেওয়ার পদ্ধতিতে সংস্কার আনছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, সেই পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। এর জেরে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে পিএর হয়ে আদায় করা করের অর্থ আটকে রাখে ইসরায়েল।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, আটকে থাকা এই অর্থের পরিমাণ এখন প্রায় ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা পিএর বার্ষিক বাজেটের অর্ধেকের বেশি।
এর ফলে পশ্চিম তীরে তীব্র আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে। পিএ হাজারো সরকারি কর্মচারীর বেতন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণে ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদে যোগ দিয়েছে ইসরায়েল। তবে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি পিএকে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করলে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ নামে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি দল গাজার নিয়ন্ত্রণ নেবে।
গাজার জন্য ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ গত বুধবার জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুদ্ধপরবর্তী গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনার কাজ অনেক দূর এগিয়েছে।
নিকোলাই বলেন, ‘আমরা খাতভিত্তিক পরিকল্পনা করছি। ব্যয় নির্ধারণ করছি। দাতাদের সঙ্গে সমন্বয় করছি। পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই পূর্ণমাত্রায় কাজ শুরু করতে প্রস্তুত আছি।’ তবে করের অর্থের বিষয়টি নিয়ে তিনি কিছু বলেননি।