
ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্বীকৃতি জানানোর পর নতুন এক জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের বর্তমান সরকারকে হটাতে তাদের ভেতরের একটি অংশের সঙ্গে সমঝোতা করে থাকতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমান সরকারকে হটাতে পারলে তাদেরই একটি অংশকে তিনি ক্ষমতায় রাখবেন।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইরানে শুরু হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে ট্রাম্পের এ অবস্থানকে অনেকে ভেনেজুয়েলায় তাঁর গৃহীত কৌশলের সঙ্গে তুলনা করছেন।
গত বৃহস্পতিবার পডকাস্ট সঞ্চালক হিউ হিউইট যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি ৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভির সঙ্গে দেখা করবেন কি না। তখন ট্রাম্প বিষয়টি এড়িয়ে যান।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাকে (পাহলভি) দেখেছি, তাঁকে একজন ভালো মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু এ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সঙ্গে দেখা করাটা ঠিক হবে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের সবাইকে সুযোগ দেওয়া উচিত। দেখা যাক কে সামনে আসে। আমি নিশ্চিত নই, এই মুহূর্তে (সাক্ষাৎ করা) উপযুক্ত কাজ হবে কি না।’
স্টিমসন সেন্টারের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক রান্ডা স্লিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে একটি বার্তা পাঠাচ্ছেন। বার্তাটি হলো ভেনেজুয়েলার দিকে তাকান। খামেনিকে সরিয়ে দিন, আমি চুক্তির জন্য প্রস্তুত।’
ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকারের পর গতকাল শুক্রবার সকালে পাহলভি ইরানের বিক্ষোভে ‘হস্তক্ষেপ’ করতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান। এক্সে পাহলভি লেখেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনার মনোযোগ ও সহায়তার জন্য এটি একটি জরুরি ডাক। গত রাতে আপনি দেখেছেন, লাখ লাখ সাহসী ইরানি বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তায় লড়াই করেছেন। আজ তাঁরা কেবল বুলেট-ই নয়, বরং সব ধরনের যোগাযোগ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার মুখে পড়েছেন। কোনো ইন্টারনেট নেই, কোনো ল্যান্ডলাইন নেই।’
ইরান ছেড়ে পালানো শাহের ছেলে পাহলভি ট্রাম্পের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘আপনি প্রমাণ করেছেন, আপনি শান্তির পক্ষের মানুষ এবং কথার বরখেলাপ করেন না। দয়া করে হস্তক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত থাকুন।’
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের ইরান–বিশেষজ্ঞ আলি আলফনেহ মনে করেন, ইরানের ভেতরে যাঁরা বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চান, তাঁদের জন্য ভেনেজুয়েলা একটি রোডম্যাপ বা পথনকশা হতে পারে।
আলফনেহ এক্সে লিখেছেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব হয়তো ভেনেজুয়েলার মতো টিকে থাকার কৌশল নিতে পারে। খামেনিকে সরিয়ে দেওয়া, ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করা, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ইরানে আমন্ত্রণ জানানো এবং বর্তমান কাঠামো বজায় রেখেই অর্থনীতি স্থিতিশীল করা।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানিয়েছে, বিদেশে থাকা ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের দেশ চালানোর মতো জনসমর্থন নেই। তাই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং তেলের প্রবাহ সচল করতে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ওপর ভরসা করাটাই ছিল সবচেয়ে ভালো বিকল্প।
ইরানের বাইরে প্রবাসীদের মধ্যে রেজা পাহলভির কিছু অনুসারী থাকলেও ১৯৭৯ সালে তাঁর বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তিনি আর ইরানে পা রাখেননি। গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় তিনি ইরান সরকারকে উৎখাতের যে ডাক দিয়েছিলেন, তাতে তেমন সাড়া মেলেনি।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পর গ্রিনল্যান্ড থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে, হোয়াইট হাউস যেকোনো সময় সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে। ট্রাম্প নিজেও তাঁর এই পদক্ষেপের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা উপভোগ করছেন বলে মনে হয়।
চলতি সপ্তাহে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই।’ তিনি আরও বলেন, তাঁর সামরিক শক্তি ব্যবহারের সীমা হলো কেবল তাঁর ‘নিজের নৈতিকতা’। যদিও মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের রয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এবং লিন্ডসে গ্রাহামের মতো মার্কিন রাজনীতিকেরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা ও মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে ইরান। এই বার্তা ইরানে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১১১টি শহরে ১৩ দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবনে আগুন দিচ্ছেন। গত কয়েক বছরের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে এটি সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ২৫ থেকে ৪২ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি।’
২০২২ সালে মাসা আমিনির মৃত্যুর পর এবারের বিক্ষোভই সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে এবারের বিক্ষোভের মূল কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি। জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের আগে থেকেই ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান কমছিল। কিন্তু সংঘাত বন্ধ হওয়ার পর ডলারের বিপরীতে এর মান আরও ৪০ শতাংশ কমে গেছে।