ইউক্রেন যুদ্ধে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শাহেদ ড্রোনের ব্যবহার শুরু করে রাশিয়া
ইউক্রেন যুদ্ধে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শাহেদ ড্রোনের ব্যবহার শুরু করে রাশিয়া

যুদ্ধে ইরানকে যেসব সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া

চলমান যুদ্ধে ইরানকে রাশিয়ার সামরিক সহায়তার ব্যাপ্তি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণা, এটি ‘সামান্য’। ১৩ মার্চ ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, মস্কো ‘তাদের সামান্য সাহায্য করতে পারে’।

এক দিন পর বিস্তারিত উল্লেখ না করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, তেহরানের সঙ্গে মস্কোর সামরিক সহযোগিতা ‘ভালো’।

আরাগচির কথা থেকে আগের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেরই সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে। এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রাশিয়া ইরানকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের অবস্থান–সম্পর্কিত স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে।

পাশ্চাত্যের সামরিক স্যাটেলাইটের শ্রেষ্ঠত্ব এখন সুস্পষ্ট। বিশেষ করে ইলন মাস্কের কোম্পানি স্পেস-এক্স চোরাইপথে আনা স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনালগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া বড় ধরনের যোগাযোগ সমস্যা ও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। সে তুলনায় বিষয়টিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না–ও হতে পারে।

রাশিয়ার মহাকাশ কর্মসূচি ও সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জানাশোনা আছে এমন একজনের মতে, ইরান যেসব মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের তথ্য পাচ্ছে, সেগুলো সম্ভবত রাশিয়ার একমাত্র সচল নজরদারি স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ‘লিয়ানা’ থেকে আসছে।

মার্কিন চিন্তন প্রতিষ্ঠান জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো পাভেল লুজিন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলো এবং অন্যান্য নৌবাহিনীর ওপর নজরদারি চালানো ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে লিয়ানা সিস্টেমটি তৈরি করা হয়েছে।’

নজর এখন আকাশে

ইরানের মহাকাশ কর্মসূচি এবং তাদের অন্যতম প্রধান স্যাটেলাইট ‘খৈয়াম’ তৈরিতেও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

২০২২ সালে রাশিয়ার বাইকনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপণ করা ৬৫০ কেজি ওজনের এই স্যাটেলাইটটি পৃথিবী থেকে ৫০০ কিলোমিটার উচ্চতায় কক্ষপথে ঘুরছে। এটি ভূপৃষ্ঠে থাকা এক মিটার (৩ দশমিক ৩ ফুট) বা তার চেয়ে বড় আকারের বস্তু চিহ্নিত করতে পারে।

লুজিন বলেন, তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে মস্কো ‘ইরানের অপটিক্যাল ইমেজিং স্যাটেলাইট থেকে তথ্য গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করতে পারে এবং নিজস্ব বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইটের তথ্য বিনিময় করতে পারে’।

গত বুধবার তেহরান একাধিক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আব্রাহাম লিংকন রণতরিতে আঘাত হানার দাবি করে। তবে পেন্টাগন এই দাবিকে ‘নিছক কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। গত রোববার ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করে, ভারত মহাসাগরে জ্বালানি নেওয়ার সময় একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলায় সেখানে ‘বিশাল অগ্নিকাণ্ড’ ঘটেছে। ওয়াশিংটন এই হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইরানের রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি আবাসিক এলাকার ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য। আরাদ, দক্ষিণ ইসরায়েল, ২৬ মার্চ ২০২৬

কয়েক দশক ধরে রাশিয়া ইরানকে শত শত কোটি ডলারের সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ বিমান ও যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান এবং স্নাইপার রাইফেল।

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কো আল–জাজিরাকে বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে রাশিয়া তেহরানকে ‘গোয়েন্দা তথ্য, ডেটা, পরামর্শ এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ’ দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।

মস্কো ও তেহরান তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বের কথা জোর গলায় বলে এলেও তাদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। মস্কো এই সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি।

তবে অস্ত্র সরবরাহ হয়েছে উভয় পক্ষ থেকেই। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর থেকে তেহরান মস্কোকে গোলাবারুদ ও কামানের গোলা, আগ্নেয়াস্ত্র এবং স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।

‘কমেটযুক্ত’ শাহেদ ড্রোন

আর এরপরই আছে শাহেদ আত্মঘাতী ড্রোন। ধীরগতির এই ড্রোন কর্কশ শব্দ করে, তবে নির্মাণ খরচ অনেক কম। ইউক্রেনের শহরগুলোতে এগুলো প্রথমে একসঙ্গে কয়েক ডজন এবং পরবর্তী সময়ে কয়েক শ একসঙ্গে ছোড়া হতো।

ইউক্রেন এসব ড্রোন ভূপাতিত করায় এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে সস্তা ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের গণ-উৎপাদন করছে। কিয়েভ এখন উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজস্ব প্রযুক্তিজ্ঞান সরবরাহ করছে। ওই দেশগুলোতে গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ইরানের হামলার শিকার হয়।

যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটি আক্রোতিরির আকাশে আলোর ঝলকানি। সাইপ্রাস, ২ মার্চ ২০২৬

ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় মস্কো শাহেদ ড্রোনগুলোর উৎপাদন ও আধুনিকায়ন করেছে। এগুলোকে আগের চেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন ও প্রাণঘাতী করার পাশাপাশি ক্যামেরা, নেভিগেটর এবং মাঝেমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডিউল দিয়ে সজ্জিত করেছে। আর আধুনিকায়নের কিছু অংশ আবার ইরানে ফিরে এসেছে।

৭ মার্চ যুক্তরাজ্যের টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ মার্চ দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর ছোড়া একটি শাহেদ ড্রোন সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। ওই ড্রোনে রাশিয়ার তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে রাশিয়ার তৈরি স্যাটেলাইট নেভিগেশন মডিউল কোমেটা-বি (কমেট বি) ছিল। এটি অ্যান্টি-জ্যামিং শিল্ড হিসেবেও কাজ করে, যা ড্রোনগুলোকে যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে রাশিয়া তেহরানকে ‘গোয়েন্দা তথ্য, ডেটা, পরামর্শ এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ’ দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে
ইহোর রোমানেঙ্কো, সাবেক উপপ্রধান, ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ

ইউক্রেনে পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ করা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফুরাতে এবং সেগুলোকে বিভ্রান্ত করতে রাশিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে আসল ও ডামি (ডিকয়) ড্রোন পাঠানোর কৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে এই পদ্ধতি ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সহায়তা করছে।

উত্তর ইরাকের ইরবিলে পশ্চিমা বাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোনের হামলার পর ১২ মার্চ ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেন, ‘আমি মনে করি, ইরানের কিছু কৌশল এবং সম্ভবত তাদের সক্ষমতার পেছনে পুতিনের অদৃশ্য হাত রয়েছে।’

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান যদি ড্রোনের সংকটে পড়ে, তবে রাশিয়ার কৌশল কিংবা তাদের সরবরাহ করা স্যাটেলাইট তথ্য কোনো কাজে আসবে না।

মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করে আসা রুশ বিশেষজ্ঞ নিকিতা স্মাগিন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘রাশিয়া তথ্য সরবরাহ করে, এটি স্পষ্ট। এ তথ্য ইরানকে সাহায্যও করে, তবে ততটা নয়।’

জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলই মিত্রোখিনের মতে, মার্চের শুরুর দিকে চার দিনব্যাপী ব্যাপক হামলার সময় ইরান দিনে ২৫০টি পর্যন্ত ড্রোন ব্যবহার করলেও বর্তমানে তারা দিনে মাত্র ৫০টির মতো ড্রোন ছুড়ছে। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান খুব দ্রুতই তার দম হারিয়ে ফেলেছে।’

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রাঙ্গণে গত সপ্তাহে ড্রোন ও রকেট হামলার পরের চিত্র

‘শুভেচ্ছার নিদর্শন’

তদুপরি মস্কো যে ইরানের সামরিক বিজয়ে খুব বেশি আগ্রহী, তা নয়। কারণ, এই যুদ্ধ ইউক্রেনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নিজের যুদ্ধের জন্যই লাভজনক হয়ে উঠছে।

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাবেক উপপ্রধান রোমানেঙ্কো বলেন, তেলের আকাশচুম্বী দাম ‘পুতিনকে পরবর্তী বৈরিতা চালিয়ে যাওয়ার আর্থিক সক্ষমতা এনে দিয়েছে।’

ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করায় গত তিন সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। উদ্ভূত অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার জাহাজে পরিবাহিত তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হন।

এর ফলে চীন অভিমুখী রুশ তেলবাহী ট্যাংকারগুলো মাঝসমুদ্র থেকে ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, দেশগুলো সমুদ্রপথে থাকা রাশিয়ার তেলের চালান নিজেদের হাতে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে।

ইউক্রেনে পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ করা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফুরাতে এবং সেগুলোকে বিভ্রান্ত করতে রাশিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে আসল ও ডামি (ডিকয়) ড্রোন পাঠানোর কৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে এই পদ্ধতি ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সহায়তা করছে।

রোমানেঙ্কো বলেন, পুতিন ইউক্রেনে তাঁর লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। তাই তিনি নিজের লক্ষ্য হাসিলে ইরানে যুদ্ধ, মিথ্যাচারসহ যেকোনো কিছু ব্যবহার করবেন এবং তাঁর আল্টিমেটাম নিয়ে চাপ সৃষ্টি করবেন।

মার্কিন-ব্রিটিশ চিন্তন প্রতিষ্ঠান নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট ফেলো রুসলান সুলেইমানভ আল–জাজিরাকে বলেন, ক্রেমলিন ‘এই যুদ্ধে বড় কোনো সাফল্য খুঁজছে না এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পরাজিত করতে ইরানকে সহায়তাও করছে না।’

রুসলান বলেন, বর্তমান গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা মূলত ‘একটি শুভেচ্ছার নিদর্শন’ এবং সাহায্যের একটি বিভ্রম তৈরির প্রচেষ্টামাত্র। এর উদ্দেশ্য তেহরানকে এটি দেখানো যে আনুষ্ঠানিক কোনো অঙ্গীকার না থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া বিপদে তার বন্ধুকে ছেড়ে যাচ্ছে না।’

তেহরানও পুরোপুরি বোঝে যে মস্কোর এই সহায়তা কতটা অপর্যাপ্ত। আর সে কারণেই তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া এবং তেলের আকাশচুম্বী দামের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার নিজস্ব কৌশলের ওপরই নির্ভর করছে।

এই গবেষক আরও বলেন, ‘ইরানিরা বোঝে যে সামরিক শক্তি সমান নয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হারানো অসম্ভব। রাশিয়ার কোনো সহায়তাই এ ক্ষেত্রে কাজে আসবে না।’

মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের সেই মূল্যায়ন—মস্কো সম্ভবত ‘তাদের (ইরানকে) সামান্য সাহায্য করছে’—খুব একটা ভুল নয়।