হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি

মুখোমুখি লড়াইয়ে হুতি ও সরকারি বাহিনী, সৌদিতেও হামলা

লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়েমেনের বন্দরনগরী মোখা পতনের পর দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ শহরের কাছে কাধা এলাকায় দুই পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ চলছে।

হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর মারিবের দিকে অগ্রসর হলে সেখানেও তারা সরকারি বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। শহরটি হুতিদের দখলে গেলে দেশটির উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবেও হামলা জোরদার করেছে। রোববার তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে।

সশস্ত্র গোষ্ঠীটি বলছে, গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি বাহিনী ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাইজ ও মারিবের কাছেও তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

রোববার হরমুজ প্রণালির কাছে জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরান জানিয়েছে, হরমুজের অদূরে কাসেম দ্বীপের কাছে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। এতে একজন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে চারজন।

এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিসহ মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য সোমবার ওমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছে ইরান। অবশ্য বাহরাইন জানিয়েছে, তারা এ বৈঠকে অংশ নেবে না।

আয়ারল্যান্ডের ডুনবেগে নিজের গলফ রিসোর্টে রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, হরমুজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো বৈঠক করলে তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। এটি তাদের বিষয়।

জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, জুলাই থেকে ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, চলতি সপ্তাহে দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে।

তাইজ ও মারিবে তীব্র লড়াই

তাইজ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে মাকবানাহ জেলার কাধা এলাকায় হুতি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি জানান, বৃহস্পতিবার মোখা শহরের পতনের পর এটিই দুই পক্ষের প্রথম সরাসরি সংঘর্ষ। সরকারি বাহিনী সেখানে বিমান হামলাও চালাচ্ছে। দুই পক্ষই সেখানে অতিরিক্ত সেনা পাঠাচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের মারিবের পশ্চিমে আল-মাশজাহ ও আল-জোর এলাকায় হুতিদের বড় ধরনের একটি হামলা সরকারি বাহিনী ঠেকিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাস ক্যাম্পের কাছেও সংঘর্ষ চলছে। সেখানে ব্যাপক গোলাগুলির পাশাপাশি হুতিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।

ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা বড় তেল ও গ্যাসকেন্দ্র রয়েছে মারিবে। শহরটিতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাও রয়েছে। এটি উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর প্রধান সরবরাহ ঘাঁটি। আল–জাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরির ভাষায়, যে পক্ষ এটি নিয়ন্ত্রণ করবে, ইয়েমেনের রাজস্বের প্রবাহ তার হাতে থাকবে।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা

ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০১৪ সালে। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে এবং দেশটির বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি জোট ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। তবে ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে সংঘাত নতুন করে তীব্রতর হওয়ায় গৃহযুদ্ধ আবার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, জুলাই থেকে ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, চলতি সপ্তাহে দুই হাজারের বেশি মানুষ লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে।

‘হুতিদের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে’

মোখা ও পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সরকারি বাহিনী বিমান হামলা চালাচ্ছে। সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি বলেছেন, মোখা-ধুবাব সড়কে হুতিদের যানবাহন ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তাইজ অঞ্চলেও হুতিদের অবস্থান ও ব্যারাকে তিনটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

সরকারি বাহিনীর একটি অংশ লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল থেকে সরে গিয়ে মারিবে পুনর্গঠিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য ও মারিবের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা। তিনি মোখা ও পশ্চিম উপকূলে সরকারি বাহিনীর পরাজয়কে ‘দুঃখজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইয়েমেনের সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স জানিয়েছে, গত ৯ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম উপকূলে হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের পাঁচ শতাধিক সেনা নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। বাহিনীটির দাবি, একই সময়ে হুতিদের হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি।

হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার পেছনে সরকারপন্থী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভক্তি ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন মোহাম্মদ আল-বাশা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান বাশা রিপোর্ট রিস্ক অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিশ্লেষক আল–বাশা আল–জাজিরাকে বলেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিভাজনের কারণে হুতিদের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সৌদি আরব ও ইয়েমেন সীমান্তের আল-ওয়াদিয়াহ সীমান্তচৌকির কাছে হামলায় ট্রাকে আগুন ধরে গেলে সেগুলো বিস্ফোরিত হয়। ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভিডিও থেকে নেওয়া স্থিরছবি

সৌদিতে হামলা, বাড়ছে উদ্বেগ

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরবও বিমান হামলা চালাচ্ছে। হুতিদের দাবি, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া এলাকায় সৌদি বাহিনী ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাইজ ও মারিবের কাছেও হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে।

শনিবার সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানায়, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে জাজান প্রদেশের আল-তুওয়াল এলাকায় একটি হামলা হয়েছে। এতে কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, তাঁরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছেন। তাঁর দাবি, ঘাঁটির অস্ত্রের গুদাম, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ অবশ্য এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।

এরই মধ্যে হুতিদের ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি আরবের বন্দরনগরী ইয়ানবুতে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের চাহিদা মেটানোর মতো তেল মজুত আছে। তবে মিসরেও সৌদি আরবের কিছু পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে।

কয়েক দিনের মধ্যে ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন চালু করা না গেলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি থেকে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল কমার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।