মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানে হামলা চালানো নিয়ে কেন দোলাচলে ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চূড়ান্ত সীমা (রেড লাইন) নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন এক মাসের বেশি সময় আগে। তখন ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে ইরানে ‘কঠিন আঘাত’ হানা হবে। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি এ-ও বলেছিলেন যে ‘সাহায্য আসছে’।

তবে প্রতিশ্রুতিমতো আর এগোননি ট্রাম্প। গত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তিনি বলেন, ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে। যদিও তখনো বিক্ষোভকারীর ওপর দমনপীড়ন চলছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসছিল। এর পর থেকে ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে চুপ ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বরং এখন সরব হয়েছেন—ইরান কেন পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারবে না, তা নিয়ে। বারবার হুমকি দিচ্ছেন—বলছেন, তেহরান চুক্তি না করলে ‘খারাপ পরিণতি’ ঘটবে।

পরিস্থিতি অবশেষে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। সেই সিদ্ধান্তটি কী হতে পারে? ট্রাম্প হয়তো যে চূড়ান্ত সীমার কথা বলে আসছেন, তা কার্যকর করবেন। অথবা এমন কিছু করবেন, যা রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে ইরান হামলা চালালে রাজনৈতিকভাবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিই তৈরি হবে।

হামলার বিষয়টি কেন সামনে এল? সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের বৈঠকের মাত্র দুই দিন পর গত বৃহস্পতিবার তেহরানকে একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন ট্রাম্প। সেদিন গাজা ‘শান্তি পর্যদের’ (বোর্ড অব পিস) বৈঠকে তিনি বলেছেন, ইরান যদি ১০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি না করে, তাহলে দেশটিতে হামলা চালাবে মার্কিন বাহিনী। সিএনএনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই ইরানে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।

পরে ওই সময়সীমা নিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানে (মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমান) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ১০ থেকে ১৫ দিনই যথেষ্ট সময়, এটাই মোটামুটি সর্বোচ্চ সময়।’

আরব সাগরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন

হামলার বিপক্ষে মার্কিনরা

গত বছরের জুনে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ক্যারিবীয় সাগরে মাদক পাচারকারী তকমা দিয়ে একের পর এক নৌযানে হামলা চালিয়েছে দেশটি। এতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গত মাসে ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এই পদক্ষেপগুলো মার্কিনরা এখন পছন্দ করছে না।

গত মাসে করা বিভিন্ন জরিপেই তা দেখা গেছে। যেমন একটি জরিপ চালিয়েছিল ইপসস। তাতে দেখা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়নের জবাবে দেশটিতে হামলা চালানোর বিপক্ষে ছিলেন ৪২ শতাংশ মানুষ। পক্ষে ছিলেন মাত্র ১৬ শতাংশ। একই বিষয় নিয়ে সিবিএস নিউজ-ইউগভের জরিপে হামলার বিপক্ষে ছিলেন ৬৭ শতাংশ মানুষ। পক্ষে ছিলেন ৩৩ শতাংশ।

গত মাসেই কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির জরিপে নিবন্ধিত মার্কিন ভোটারদের ৭০ শতাংশ মত দিয়েছিলেন যে ইরানে বিক্ষোভকারীরা নিহত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের এতে জড়ানো উচিত হবে না। ওই জরিপে বেশির ভাগ রিপাবলিকানও ইরানে হামলার বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ গত বছরের জুনে ইরানে হামলার পরপরই কুইনিপিয়াকের করা একটি জরিপে হামলার সমর্থন দিয়েছিলেন ৪২ শতাংশ ভোটার।

পাল্টা হামলার শঙ্কা

সিবিএস ও কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির গত জুনের জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনের ৮ জন অংশগ্রহণকারীই অন্তত কিছুটা হলেও বড় পরিসরে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার শঙ্কায় ছিলেন। এমনকি প্রতি ১০ জনের ৬ জন রিপাবলিকানও সেটিই মনে করতেন। আর সিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ৭১ শতাংশ মার্কিন মনে করতেন যে ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে তেহরান।

এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, গত বছরে ইরান বা চলতি বছরে ভেনেজুয়েলায় হামলা নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না মার্কিনরা। হামলাগুলোর উদ্দেশ্য কী—সে ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিলেন না। এসব হামলার ভবিষ্যৎ ফল কী হতে পারে, তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তবে হামলাগুলো যেহেতু স্বল্প সময়ের জন্য হয়েছিল, তাই তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জানা যেতে পারে ইরান নিয়ে নিজের চূড়ান্ত সীমা কার্যকর করার বিষয়টিতে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প। তবে এখন যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো নিজেকে একটি কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আর এটি এমন সময়ে ঘটছে, যখন তাঁর জনপ্রিয়তা কমেই চলেছে।