একটি দেয়ালের ওপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন একদল অভিবাসী শ্রমিক। পেছনে সুউচ্চ দালানকোঠা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে, ১১ মার্চ ২০২৬
একটি দেয়ালের ওপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন একদল অভিবাসী শ্রমিক। পেছনে সুউচ্চ দালানকোঠা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে, ১১ মার্চ ২০২৬

জীবিকার জন্য বিদেশে এসে এখন যুদ্ধের মধ্যে পড়ে নিরুপায়

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরদিনই দুবাইয়ে এক বাংলাদেশি ডেলিভারি রাইডার আবার তাঁর বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। রাস্তাঘাট অন্য সময়ের তুলনায় বেশ শান্ত, তবে বকশিশের পরিমাণ ছিল বেশ ভালো।

তবে একই শহরে চার বছর ধরে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার শিফটে কাজ করা এক পাকিস্তানি রাইডারের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।

মিডল ইস্ট আইকে ওই চালক বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি টাকা উপার্জন করতে। এখন যেকোনো পরিস্থিতিতেই কাজ করা আমার জন্য একপ্রকার আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে ভয় পেলেও আমাদের মতো রাইডারদের সাহস নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি ডেলিভারির জন্যই আমি টাকা পাই। তাই আমি যদি কাজ না করি, তবে আমাকে হয়তো না খেয়ে থাকতে হবে।’

ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর যুদ্ধে এখন অস্থির গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এর মধ্যেই লাখো পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, গাড়িচালক এবং নিরাপত্তাপ্রহরীই উপসাগরীয় দেশগুলোর চাকা সচল রেখেছেন। ওই রাইডার তাঁদেরই একজন।

যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলায় অন্তত ১২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; কারণ, সেখানে এখন পর্যন্ত নিহত হওয়া প্রতিটি বেসামরিক ব্যক্তি বাংলাদেশ, নেপাল বা পাকিস্তানের প্রবাসী শ্রমিক।

নিহতদের একজন ৫৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক সালেহ আহমেদ। যুদ্ধের প্রথম দিন সংযুক্ত আরব আমিরাতে পানি সরবরাহ করার সময় তিনি প্রাণ হারান।

যুদ্ধের মধ্যে লাখো পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, গাড়িচালক এবং নিরাপত্তাপ্রহরীই উপসাগরীয় দেশগুলোর চাকা সচল রেখেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলায় অন্তত ১২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আমিরাতে নিহত হওয়া বেসামরিক ব্যক্তিদের সবাই বাংলাদেশ, নেপাল বা পাকিস্তানের প্রবাসী শ্রমিক।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে বিশালসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক, যাঁরা কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার বড় অংশ, তাঁদের কার্যত ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ইকুডেমের নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কাদরি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডানে তাঁদের সংস্থার প্রবাসী শ্রমিক গবেষক নেটওয়ার্ক কাজ করছে। তাঁদের অনুসন্ধানে এসব দেশে প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও মানসিক ট্রমায় পড়ার তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকেও তাঁদের দৃশ্যত বাদ দেওয়ার বিষয়টি নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

কাদরি বলেন, ‘শ্রমিকেরা যে দেশ থেকেই আসুন না কেন, তাঁদের সবার মধ্যে ট্রমা, আতঙ্ক আর উদ্বেগ একই রকম। আমি এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এবং ভিন্ন ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত নারী ও পুরুষ—উভয় শ্রেণির শ্রমিকের কথাই বলছি।’

কাদরির দৃষ্টিতে, এই শ্রমিকেরা সুনির্দিষ্টভাবে দুই ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

প্রথমটি হলো সরকারি নিরাপত্তাসংক্রান্ত যোগাযোগ বা নির্দেশনা থেকে তাঁদের বাদ দেওয়া। যদিও কিছু আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ‘সকল বাসিন্দার’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু মাঠপর্যায়ে কর্মরত শ্রমিকেরা বলছেন, আশ্রয়কেন্দ্র, নিরাপদ স্থানান্তর পথ বা জরুরি সহায়তার বিষয়ে তাঁরা কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা পাননি।

দ্বিতীয়টি হলো কাঠামোগত বৈষম্য। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমাজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—নির্মাণ, আতিথেয়তা (হসপিটালিটি), স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, গৃহস্থালি কাজ এবং কৌশলগত—সবখানেই এই প্রবাসী শ্রমিকেরা অপরিহার্য। ফলে যখন হামলা চলে, তখনো তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বিপদ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বদলে উল্টো বিপদের মুখেই এগিয়ে যেতে হয়।

অনেকে ভয় পেলেও আমাদের মতো রাইডারদের সাহস নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। প্রতিটি ডেলিভারির জন্যই আমি টাকা পাই। তাই আমি যদি কাজ না করি, তবে আমাকে হয়তো না খেয়ে থাকতে হবে।
—প্রবাসী শ্রমিক, দুবাইয়ে কর্মরত

কাদরি বলেন, অপেক্ষাকৃত গরিব দেশগুলো থেকে আসা শ্রমিকদের দিয়ে এই কঠিন কাজগুলো করিয়ে নেওয়ার পেছনে একটি সচেতন সিদ্ধান্ত কাজ করে। কারণ, তাঁদের বেতন কম দিতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের ক্ষমতাও অনেক কম। ফলে তাঁরা অভিযোগ করার বা নিজেদের সুরক্ষার দাবি জানানোর সুযোগ পান না।

তাঁর চোখে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ডেলিভারি রাইডার এবং ‘গিগ ইকোনমি’ বা খণ্ডকালীন চুক্তিতে কাজ করা অন্য শ্রমিকদের অবস্থা। যখন তাঁদের সচ্ছল গ্রাহকেরা নিরাপদ আশ্রয়ে ঘরে অবস্থান করেন, তখন এই শ্রমিকদের ঠিকই খোলা আকাশে কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যে ডেলিভারি সেবার ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বা সওদা করতে বাইরে বের হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে তাঁরা ঘরে থাকতেই পছন্দ করছেন।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধ্বংসযজ্ঞের অধিকাংশ দৃশ্যই ধারণ করেছেন এবং শেয়ার করেছেন এই প্রবাসী শ্রমিকেরা। তাঁরা নিজেদের মুঠোফোনে এসব চিত্র ধারণ করছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বাহরাইন পাঁচজন পাকিস্তানি এবং একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, হামলার পরবর্তী দৃশ্য ধারণ করার সময় তাঁরা ইরানের এই হামলার প্রশংসা করছিলেন।

‘একের পর এক অর্ডার’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বড় বড় ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মে কর্মরত তিনজন রাইডারের সঙ্গে কথা বলেছে মিডল ইস্ট আই। তাঁদের প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, কোনো ধরনের নির্দেশনা, সহায়তা বা বিকল্প ছাড়াই তাঁদের মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন এই রাইডাররা। তবে নিজেদের কর্মসংস্থান বা চাকরি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তাঁরা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

দুই বছর ধরে একটি কোম্পানিতে কর্মরত এক বাংলাদেশি রাইডার বলেন, প্রথম হামলার দিন রাস্তাঘাট একদম জনশূন্য ছিল। কিন্তু তার পরদিন থেকেই তাঁকে আবারও ডেলিভারি দেওয়ার জন্য রাস্তায় নামতে হয়েছে। তিনি লক্ষ করেছেন, সাধারণ সময়ের চেয়ে এখন গ্রাহকেরা টিপস বা বকশিশ একটু বেশিই দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ তাদের নাগরিকদের অঞ্চলটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। ফলে এই রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে খুব একটা চাপ বা তাগিদ নেই।
- মোস্তফা কাদরি, নির্বাহী পরিচালক, ইকুডেম

আবুধাবিতে পাঁচ বছর ধরে কর্মরত এক পাকিস্তানি রাইডার জানান, হামলার ঠিক পরের দিনগুলো ছিল এককথায় ‘বিরামহীন’। স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ ঘর থেকে বের হতে অনাগ্রহী থাকায় তাঁদের কাছে ডেলিভারির ফরমায়েশ বা অর্ডারের জোয়ার বইছিল।

তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমি দিন-রাত এক করে কাজ করেছি, মাঝেমধ্যে শুধু অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতাম।’

তাঁর ধারণা অনুযায়ী, রাস্তায় সাধারণ সময়ের তুলনায় মাত্র ৭০ শতাংশ মানুষ চলাচল করছিল। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রচুর পরিমাণে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করার জন্য অর্ডার দিচ্ছিল।

সিরিজ বিস্ফোরণের পর আকাশজুড়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। বাহরাইনের মানামায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

দুবাইয়ে একই কোম্পানিতে চার বছর ধরে কর্মরত আরেক পাকিস্তানি রাইডার এমন এক অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন, যেখানে ভয়ের কোনো স্থান নেই। অর্থাৎ মৃত্যুভয় থাকলেও কাজ থেকে পিছু হটার কোনো উপায় নেই।

তিনি বন্ধুদের সঙ্গে একটি মেসে থাকেন এবং দিনে ১২ ঘণ্টার শিফটে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘কোম্পানি আমাকে কেবল প্রতিটি ডেলিভারির ওপর ভিত্তি করে টাকা দেয়। আমি যদি কাজে না বের হই, তবে আমার কোনো আয় নেই।’

হামলার ভয়াবহতা যখন ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই প্রবাসী শ্রমিকেরাই হয়ে উঠেছেন যুদ্ধের প্রভাব টুকে রাখার প্রধান সাক্ষী।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধ্বংসযজ্ঞের অধিকাংশ দৃশ্যই ধারণ করেছেন এবং শেয়ার করেছেন এই প্রবাসী শ্রমিকেরা। তাঁরা নিজেদের মুঠোফোনে এসব চিত্র ধারণ করছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বাহরাইন পাঁচজন পাকিস্তানি এবং একজন বাংলাদেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, হামলার পরবর্তী দৃশ্য ধারণ করার সময় তাঁরা ইরানের এই হামলার প্রশংসা করছিলেন।

কাদরি আশঙ্কা করছেন, আগামী দিনে আরও অনেক শ্রমিক গ্রেপ্তার হতে পারেন এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো ঘটনার ভিডিও ধারণ করার অপরাধে কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির রেকর্ড রয়েছে।

কাদরি বলেন, এটি অনেকটা গাজার পরিস্থিতির মতোই, যেখানে একটি সমাজের সবচেয়ে অসহায় বা সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরাই যুদ্ধক্ষেত্রের ‘চোখ ও কান’ (তথ্যদাতা বা সাক্ষী) হয়ে ওঠেন। আর এই দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁদের কোনোভাবেই হেনস্তা বা নিগৃহীত করা উচিত নয়।

এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে শ্রমিক পাঠানো বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, কেনিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোর ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল কূটনৈতিক রেকর্ড। নিজেদের নাগরিকদের অর্থবহ কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দেশগুলোর ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিকেরা দুই ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। প্রথমটি হলো সরকারি নিরাপত্তাসংক্রান্ত যোগাযোগ বা নির্দেশনা থেকে তাঁদের বাদ দেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো কাঠামোগত বৈষম্য। যখন হামলা চলে, তখনো তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বিপদ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বদলে উল্টো বিপদের মুখেই এগিয়ে যেতে হয়।

কাদরি বলেন, প্রবাসীদের নিজ নিজ দেশের মানুষ ও পরিবারগুলো তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় সরকারকে পদক্ষেপ নিতে চাপ দিচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে পাওয়া সাড়া বা ভূমিকা খুবই অপর্যাপ্ত।

উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলার কারণে চরম ঝুঁকিতে আছে নেপালি শ্রমিকদের জীবন। নেপালের ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানের কারণে এসব স্থানে তাঁরা নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পান। এসব ঘাঁটির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ঝুঁকি বাড়লে পশ্চিমা বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়, অথচ রান্নাবান্না বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো জরুরি সেবা চালু রাখতে অভিবাসী শ্রমিকদের ঠিকই সেখানে রেখে দেওয়া হয়।

কাদরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, যারা এই যুদ্ধের সূচনা করেছে এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশ যারা পরোক্ষভাবে একে সমর্থন দিচ্ছে, তারা তাদের নিজেদের নাগরিকদের অঞ্চলটি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। ফলে এই রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে খুব একটা চাপ বা তাগিদ নেই।

অনুভূতিহীনতা

কাতারে শাহীন আবদুল্লাহ যখন তাঁর বাড়ির কাছের প্রধান সড়কে মোড় নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিস্ফোরণ শুরু হয়। তিনি তৎক্ষণাৎ গাড়ি থামিয়ে দেন। আগুনের কুণ্ডলী পাকানো একটি স্প্লিন্টার (লেলিহান ধাতব টুকরা) ঠিক তাঁর গাড়ির সামনে এসে পড়ে। গাড়ির পেছনের আসনে থাকা তাঁর পরিবারের সদস্যরা এই ভয়াবহ দৃশ্যটি চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করেন।

শাহীন আবদুল্লাহ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমি যদি পারতাম, তবে চাইতাম তারা যেন এই দৃশ্য দেখতে না পারে।’

বিস্ফোরণের পর শাহীন পুলিশকে ফোন করেছিলেন। তাঁকে লাইনে অপেক্ষা করিয়ে রাখার মধ্যেই পুলিশ সদস্যরা সেখানে পৌঁছে এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। শাহীন বলেন, ‘মুহূর্তের জন্য আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু পরক্ষণেই আর খুব একটা ভাবিনি।’

শাহীন আবদুল্লাহর যে অনুভূতিহীনতা, এটাই এখন সবার স্বাভাবিক অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দোহায় একটি দোকানের মালিক শাহীন এমন এক অভিবাসী শ্রমিক সমাজের কথা বলেন, যাঁদের সামনে চলমান পরিস্থিতি মুখ বুজে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কারণ, দোকানপাট, রেস্তোরাঁ আর ডেলিভারি সেবাগুলো কোনোভাবেই বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই।

‘কারও পক্ষেই এক দিনের জন্য ছুটি নেওয়া সম্ভব নয়,’ বলেন তিনি।

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এই পরিস্থিতির বিপরীতে যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তার মধ্যে এক তীব্র বৈষম্যের দিকেও তিনি আঙুল তোলেন।

আমাদের আলোচনাগুলো ব্যক্তিগত মঙ্গল বা নিরাপত্তা নিয়ে নয়; বরং সেগুলো রাজনৈতিক এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই–সংক্রান্ত। ট্রমা বা মনের গভীর ক্ষতগুলো এখানে অনুচ্চারিতই থেকে যায়।
-আবদুল্লাহ শাহীন, দোহার দোকানমালিক

শাহীন আবদুল্লাহ বলেন, সবাই দেখছে কীভাবে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু যাদের ফিরে যাওয়ার মতো কিছুই নেই, তাদের মাথায় এই ‘উদ্ধার’ বা দেশান্তরের চিন্তা কাজ করে না। কারণ, সেই সামর্থ্য বা বিলাসিতা তাদের নেই।

শাহীন আবদুল্লাহ জানান, যখন তাঁদের প্রবাসী সমাজে এই যুদ্ধ বা সংঘাত নিয়ে কোনো আলাপ ওঠে, তখন নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি সেখানে খুব কমই স্থান পায়।

আবদুল্লাহ শাহীন বলেন, ‘আমাদের আলোচনাগুলো ব্যক্তিগত মঙ্গল বা নিরাপত্তা নিয়ে নয়; বরং সেগুলো রাজনৈতিক এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই–সংক্রান্ত। ট্রমা বা মনের গভীর ক্ষতগুলো এখানে অনুচ্চারিতই থেকে যায়।’

তাঁর ভাষায়, ‘মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখানে গৌণ। এখনকার মূল লক্ষ্য হলো মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা এবং যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। দিনের মধ্যে ১৫ মিনিট আকাশ থেকে পড়া জ্বলন্ত স্প্লিন্টার বা বোমার টুকরা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা—এটাকে এখন মানুষ নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে।’