ইরানের তেহরানের হাফত-ই তির স্কয়ারে একটি বুথে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এক ইরানি সামরিক সদস্য। ১৭ মে ২০২৬
ইরানের তেহরানের হাফত-ই তির স্কয়ারে একটি বুথে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এক ইরানি সামরিক সদস্য। ১৭ মে ২০২৬

ট্রাম্পের হুমকির পর বুথে বুথে গিয়ে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন সাধারণ ইরানিরা

ইরানের রাজধানী তেহরানে যখন রাত নেমে আসে এবং আলবোর্জ পর্বতমালার তুষারশুভ্র চূড়াগুলো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়, তখন হাজার হাজার ইরানি নিয়মিত রাস্তায় নেমে আসেন। যোগ দেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত সমাবেশে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমর্থকদের সংগঠিত করাই এ সমাবেশের উদ্দেশ্য।

তেহরানের একটি অভিজাত এলাকা তাজরিশ স্কয়ারের কাছে প্রতি রাতে মানুষের ঢল নামে। প্রায় সবার হাতে ইরানি পতাকা। এই জনসমুদ্র থেকে স্লোগান ওঠে, ‘আমেরিকা নিপাত যাক’। এ সময় রাস্তার হকাররা উৎসাহী জনতার কাছে চা ও বিভিন্ন স্মারক বিক্রি করেন। এসব স্মারকের মধ্যে দেশাত্মবোধক বেসবল ক্যাপ ও নানা ধরনের লোগো অন্যতম।

তিয়ানা নামের এক তরুণীর সঙ্গে তাজরিশ স্কয়ারে সিএনএনের এই প্রতিবেদকের কথা হয়। ইরানের পতাকার রঙে রাঙানো চশমা পরা এ তরুণী গগনবিদারী স্লোগানের মধ্যে বলেন, ‘আমি আমার দেশ এবং মানুষের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুদিন ধরে ইরানে নতুন করে সামরিকর অভিযান নতুন করে শুরুর হুমকি দিয়ে আসছেন। ট্রাম্পের এসব হুমকিকে তুচ্ছজ্ঞান করে তিয়ানা বলেন, ‘সব মানুষ, পুরো সেনাবাহিনী, সব কমান্ডার নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে এবং পুরো হৃদয় ও আত্মা দিয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত।’

ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গতকাল রোববার এক পোস্টে লিখেছেন, ‘ইরানের সময় ফুরিয়ে আসছে। তাদের খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। নয়তো তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’

আমি আমার দেশ এবং মানুষের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইরানের তিয়ানা নামের এক তরুণী

এমন এক সময়ে ট্রাম্পের এই হুমকি এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি খাদের কিনারে চলে গেছে। এ সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এত কড়া হুমকি উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফারসি ভাষায় হাতে লেখা একটি প্ল্যাকার্ড বহনকারী এক বৃদ্ধ ব্যক্তি নিজ থেকে এগিয়ে এসে তাঁর প্ল্যাকার্ডটি অনুবাদ করলেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি আমাদের সীমান্তের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা এগুলো রক্ষা করব।’

ইরানের তেহরানের হাফত-ই তির স্কয়ারে অস্ত্র ধরার কৌশল শিখছেন অংশগ্রহণকারীরা। ১৭ মে ২০২৬

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করার যুক্তি দিয়ে এই বৃদ্ধ আমাকে বলেন, ‘আমাদের বোমা নয়, পারমাণবিক শক্তি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রয়োজন।’ প্রসঙ্গত, যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন ট্রাম্প।

এই বৃদ্ধ আরও বলেন, ‘ট্রাম্প জানেন, আমাদের কাছে কোনো (পারমাণবিক) বোমা নেই। তবু তিনি আমাদের আক্রমণ করছেন।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা শুরু করতে পারে—এমন একটি গুজব ইরানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ অনিবার্য বলে ধরে নিয়েছেন অনেক ইরানি।

আমাদের বোমা নয়, পারমাণবিক শক্তি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রয়োজন।
ইরানের এক বৃদ্ধ

লন্ডন ও দুবাইতে বেড়ে ওঠা বর্তমানে তেহরানের বাসিন্দা ফাতিমা বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি—তা আমরা জানি। আমরা এ–ও জানি, ট্রাম্প আসলে কোনো আলোচনা করতে যাচ্ছেন না।’

ফাতিমা আরও বলেন, ‘তাঁর (ট্রাম্প) বক্তব্য হলো, “আমি যা বলি তা করো, না হলে আমি তোমাদের মেরে ফেলব”—এমনকি আমরা যদি তাঁর কথামতো চলিও, তবু তিনি আমাদের আক্রমণ করবেন।’

একটি কালাশনিকভ রাইফেল প্রশিক্ষণ সেশন চলাকালে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ছেন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক হোসেন হোসেইনি। ১৫ মে ২০২৬

তেহরানে যেসব সমাবেশের কথা বললাম, তা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতি রাতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রায় তিন মাস ধরে প্রতি সন্ধ্যায় সারা দেশে অনুষ্ঠিত হওয়া এসব সমাবেশ ‘রাত্রিকালীন জমায়েত’ নামে পরিচিত।

সম্প্রতি পরিস্থিতি বদলে গেছে। আবার হামলা শুরু হতে পারে, এমন অশনিসংকেত থেকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট দোকান বা বুথ খোলা হচ্ছে। এসব বুথে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ইরানের শাসকগোষ্ঠী জনগণকে কীভাবে পরবর্তী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করছে, এখান থেকে তার কিছুটা আঁচ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা শুরু করতে পারে, এমন একটি গুজব ইরানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ অনিবার্য বলে ধরে নিয়েছেন অনেক ইরানি।

তেহরানের ভানাক স্কয়ারের একটি বুথে আমরা কালো চাদর পরা এক নারীকে একে-৪৭ চালানো শিখতে দেখলাম। সামরিক পোশাক পরা মুখোশধারী এক ব্যক্তি তাঁকে অস্ত্রটি খোলা ও আবার জোড়া দেওয়ার পদ্ধতি দেখিয়ে দিচ্ছেন।

এখান থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে একটি ছোট শিশুকে আনলোড করা (গুলিহীন) একটি কালাশনিকভ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে খেলতে দেখা গেল। সে অস্ত্রটি আকাশের দিকে তাক করে ট্রিগার চাপে, তারপর হাস্যোজ্জ্বল প্রশিক্ষকের কাছে সেটি ফিরিয়ে দেয়।

ইরানের তেহরানের একটি ক্যাফেতে নিজের ফোনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পোস্ট দেখছেন এক ইরানি ব্যক্তি। ১৮ মে ২০২৬

সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্র তুলে নেওয়ার সাধারণ আহ্বান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বারবার প্রচার করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি চ্যানেলের উপস্থাপকদের হাতে রাইফেল নিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেও দেখা গেছে।

রাষ্ট্রপরিচালিত অফোগ চ্যানেলের এক পুরুষ উপস্থাপক হোসেন হোসেইনি দেশটির ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এক সদস্যের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানেই স্টুডিওর ছাদ লক্ষ্য করে তাঁর রাইফেল থেকে গুলি ছোড়েন।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পরিবেশ দিন দিন যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরুর যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে তাতে মনে হচ্ছে, কট্টরপন্থী সরকারি বার্তা ছাড়া বাকি সব কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে পড়ছে।

চ্যানেল-৩-এর নারী উপস্থাপিকা মবিনা নাসিরিকে দুই হাতে একটি রাইফেল ধরে দর্শকদের উদ্দেশে কথা বলতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, ‘ভানাক স্কয়ার থেকে তারা আমার কাছে একটি অস্ত্র পাঠিয়েছে, যাতে আমিও আপনাদের মতো এটি ব্যবহার করা শিখতে পারি।’

তবে সব ইরানিই যে যুদ্ধের জন্য মুখিয়ে আছেন, তা কিন্তু নয়।

ইরানের তেহরানের একটি রাস্তায় ইসরায়েলবিরোধী একটি দেয়ালচিত্রের (ম্যুরাল) পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নারী। ১৮ মে ২০২৬

তাজরিশ স্কয়ারের সমাবেশের ঠিক কোনায়, ‘সিনেমা মিউজিয়াম অব ইরানের’ পাশের একটি শান্ত পার্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের খোলা আকাশের নিচে বইয়ের স্টল ঘুরে দেখতে এবং চা পান করতে দেখা গেছে। সেখানে যুগলদের হাত ধরাধরি করে হাঁটতেও দেখা গেছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক তরুণ বলে উঠলেন, ‘যুদ্ধকে না বলুন।’

পার্কের একটি বেঞ্চে স্বামীর পাশে বসে ছিলেন এক নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএনএনের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা দুজনেই কতটা মরিয়াভাবে ইরানের পরিবর্তন চান, তা তাঁর কথায় ফুটে ওঠে। তিনি ইংরেজিতে ফিসফিস করে বললেন, ‘আমরা একটি স্বাভাবিক দেশে বাস করতে চাই, যেখানে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আছে।’

একই পার্কে অন্য এক তরুণী বললেন, ‘আমরা শান্তি চাই।’ ইরানের জনমত কতটা ভিন্ন, তা এসব মতামত থেকে বোঝা যায়।

কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পরিবেশ দিন দিন যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরুর যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে, সরকারি বার্তা ছাড়া বাকি সব কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে পড়ছে।