এটা তাঁদের যুদ্ধ নয়, যুদ্ধে তাঁরা জড়াননি। কিন্তু ইরান যুদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাঁদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার বিরোধিতা করা বিশ্বনেতারা এখন দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন। এই টানাপোড়েনের একদিকে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় তাঁদের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষোভ, অন্যদিকে যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি গভীরভাবে বিরূপ ভোটাররা।
তাঁদের এই দ্বিধা যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্যকে বদলে দিচ্ছে। যেসব নেতা একসময় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করার এবং তাঁকে তোষামোদের চেষ্টা করতেন, তাঁরা এখন তাঁর সমালোচনা করার সাহস দেখাচ্ছেন, তাঁর থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি গভীর বিরাগ থেকে তাঁরা এমনটা করছেন, বিষয়টি শুধু তা নয়। যুদ্ধ–সম্পর্কিত চাপের কারণেও তাঁরা এটা করছেন। যুদ্ধ তাঁদের জনগণের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে, একই সঙ্গে তাঁদের নিজেদের সরকার ও নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
এমনকি যেসব নেতা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আচরণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁরাও তাঁর অবজ্ঞামূলক আচরণে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি গত সোমবার বলেছেন, পোপ লিও চতুর্দশকে নিয়ে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক কথাবার্তা ‘অগ্রহণযোগ্য’।
ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বন্ধুত্ব ভেঙে গেছে। গত সপ্তাহে স্টারমার বলেছিলেন, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের কারণে ব্রিটিশদের জ্বালানি বিল বেড়ে যাওয়ায় তিনি ‘খুবই বিরক্ত’।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি গভীর বিরাগ থেকে তাঁরা এমনটা করছেন, বিষয়টি শুধু তা নয়। যুদ্ধ-সম্পর্কিত চাপের কারণেও তাঁরা এটা করছেন। যুদ্ধ তাঁদের জনগণের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে, একই সঙ্গে তাঁদের নিজেদের সরকার ও নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
নেতারা যুদ্ধের পরিণতি নিয়েও প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। এটা এমন একটি যুদ্ধ, যার পরিণতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক ‘প্রতিকূল’ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে, যেখানে এ বছর মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে, ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাস ও তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের জন্য যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ করেছে, জানুয়ারিতে দেওয়া পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৩ শতাংশ বলা হয়েছিল।
অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার কারণে আগে থেকেই বিপর্যস্ত স্টারমার সরকারের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র জাপানও চাপের মুখে আছে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যাচ্ছে—এর ফলে জাপানে মজুরি সামান্য বৃদ্ধির যে কথা হয়েছিল, সেটাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ক্ষমতায় আসা জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে যে এত দ্রুত এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তিনি কখনো কল্পনাও করতে পারেননি।
যদিও ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই বেশ কয়েকটি মিত্রদেশে ট্রাম্প দারুণভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। গত বছর পিউ রিসার্চের একটি জরিপে দেখা গেছে, এক ডজনের বেশি দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সমর্থন হার ৩৫ শতাংশ বা তারও নিচে ছিল।
ইসরায়েল ও নাইজেরিয়ার মতো অল্প কয়েকটি দেশে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের তুলনায় ট্রাম্পের সমর্থন কিছুটা বেশি ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের সম্পর্কে এই বিচ্ছিন্নতা শুধু ট্রাম্পের আমলেই থাকবে, বিষয়টা এমন নয়। বরং এটি সেসব জোটের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে, যেগুলো দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়েছে।
যেমন ট্রাম্পের সঙ্গে ন্যাটোর বিরাগপূর্ণ সম্পর্কের কারণে তাদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তাগুলোকে দুর্বল ও অনিশ্চিত মনে হচ্ছে—যদিও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত না–ও নিতে পারেন।
ট্রাম্প নিজের বক্তব্য ও পররাষ্ট্রনীতির নথিতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁদের চোখে একুশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার সর্বোত্তম উপায় হলো একতরফাভাবে মার্কিন শক্তি প্রয়োগ করা।
গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক ‘প্রতিকূল’ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে, যেখানে এ বছর মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে, ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
ট্রাম্প ন্যাটোকে একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট হিসেবে দেখেন না; বরং তিনি এটিকে এমন একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন, যা তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
এখানে উদাহরণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে দেখানো যায়। যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ছাতার ওপর নির্ভর করে, কিন্তু এ যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের প্রতি ট্রাম্পের সহনশীলতা খুব সামান্যই বাকি আছে।
অথচ অনেক মিত্রদেশের নেতাদের জন্য যুদ্ধে অংশ নিতে রাজি হওয়া রাজনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব। তাদের ভোটাররা মনে করেন—ইরান যুদ্ধ অযৌক্তিক, এটিতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
তা ছাড়া নাইন–ইলেভেন পরবর্তী যুদ্ধে মিত্রদের ব্যাপক প্রাণহানিকে ট্রাম্প যেভাবে হেয় করেছেন, তা তাদের ভোটারদের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি বিরূপ মনোভাব আরও গভীর করেছে।
যুদ্ধ যেভাবে ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ককে চাপে ফেলেছে
আইএমএফের পূর্বাভাস স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইরান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর জন্য শুধু দূরের কোনো পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সংকট নয়; বরং এটি এখন তাদের জন্য এক অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
মিত্রদেশগুলোর নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পকে নিয়ে বিরূপ মনোভাব যেভাবে বাড়ছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে, তাঁর পাশে দাঁড়ানো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দায় হয়ে উঠবে।
ট্রাম্পের সঙ্গে আদর্শগতভাবে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ইউরোপীয় নেতাদের একজন ছিলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তিনি নিজেকে হোয়াইট হাউস ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় নিজ দেশে তাঁর জনপ্রিয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চার কোটির বেশি রোমান ক্যাথলিক বসবাস করা এবং ভ্যাটিকানের সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্ক থাকা দেশের প্রধান হিসেবে মেলোনির একটি অনন্য ভূমিকা রয়েছে। তাই ট্রাম্প যখন ক্যাথলিকদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপকে আক্রমণ করে কথাবার্তা বললেন, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের তীব্র সমালোচনা করা ছাড়া মেলোনির সামনে বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক বিকল্প ছিল না।
মেলোনির এই অবস্থান পরিবর্তন এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা কষ্টসাধ্য কূটনীতি ও সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে নষ্ট করে দিতে পারে। কারণ, মেলোনির অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্প খোলাখুলিই তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
ইতালীয় ভাষার একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘তিনি আমাকে খুবই হতবাক করেছেন। আমি ভেবেছিলাম তাঁর সাহস আছে। আমি ভুল ছিলাম। তিনি অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের একজন। কারণ, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি না এবং সুযোগ পেলে তারা ইতালিকে দুই মিনিটের মধ্যে উড়িয়ে দেবে কি না, সেটা তিনি পরোয়া করেন না।’
মেলোনি এখন বুঝতে শুরু করেছেন, ট্রাম্পের তীব্র বাক্যবাণের মুখে পড়লে ঠিক কেমন অনুভূতি হয়।
যদিও কানাডার নেতারা আগেই সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। ট্রাম্পকে মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে পাল্টে দিয়েছে।
ট্রাম্প না থাকলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা এবং রাজনীতির বাইরের মানুষ মার্ক কার্নি সম্ভবত কানাডার প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতেন না।
ট্রাম্প কানাডার সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ করে কথা বললে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন কার্নি, যা গত বছরের নির্বাচনে তাঁকে বিজয়ী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্প একসময় ইউরোপীয় জনতুষ্টিবাদীদের কাছে নায়ক ছিলেন। তাঁদের অনেকেই মনে করতেন ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অবস্থান নিজ নিজ দেশে তাঁদের রাজনৈতিক উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিন্তু গত সপ্তাহের শেষ দিকে হাঙ্গেরিতে হওয়া ভোটের ফলাফল এ ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। সেখানে ভোটে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী নেতা ভিক্টর অরবান ও তাঁর দলের ভরাডুবি হয়েছে।
দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অরবান হাঙ্গেরি শাসন করেছেন। এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প খোলাখুলি অরবানকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালাতে নিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ভোটের এক সপ্তাহ আগে হাঙ্গেরি পাঠিয়েছিলেন, যেন অবরান যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর।
এই পরাজয় সম্ভবত ইউরোপের জনতুষ্টিবাদী নেতাদের মধ্যে নিজেদের ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতাকে আরও দ্রুততর করবে।