ফিলিস্তিনের গাজায় শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বুধবার এ ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এরপর দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে বৃহস্পতিবার মিসরের রাজধানী কায়রোয় আলোচনায় বসে হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠন। যদিও পরিকল্পনার প্রথম ধাপের অনেক শর্তই এখনো পূরণ হয়নি।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতার পর গত ১০ অক্টোবর থেকে উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শুরু হয়। যুদ্ধবিরতির পরও এই ধাপে হামলা চালিয়ে শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরায়েল। মিসরের সঙ্গে গাজার সীমান্ত ক্রসিংও খুলে দেয়নি তারা। অন্যদিকে গাজায় থাকা ইসরায়েলি এক জিম্মির মরদেহ এখনো ফেরত দেয়নি হামাস।
শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপকে এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যস্থতাকারীদের আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। এমন একটি চ্যালেঞ্জ হলো উপত্যকাটির শাসকগোষ্ঠী হামাসকে অস্ত্রমুক্ত করা। কারণ, অস্ত্র ছাড়তে নারাজ তারা। এ ছাড়া শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় যে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে, তা নিয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে উইটকফ জানান, দ্বিতীয় ধাপে গাজা পরিচালনার জন্য ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করা হবে। তারা হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করবে। শান্তি পরিকল্পনার মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, কাতার ও তুরস্কের একটি যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, এই প্রশাসনে ১৫ জন সদস্য থাকবেন। তাঁদের নেতৃত্ব দেবেন আলী শায়াথ। তিনি পশ্চিম-সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন থাকবে ‘বোর্ড অব পিস’ নামের একটি আন্তর্জাতিক কমিটির অধীন। এই বোর্ডে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়া অন্য সদস্যদের মধ্যে জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক দূত নিকোলাই নিয়াদেনভের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মোট কতজন সদস্য থাকবেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানাননি স্টিভ উইটকফ।
ইউরোপীয় একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে এ–সংক্রান্ত বৈঠকের পর বোর্ড অব পিস নিয়ে আরও ঘোষণা আসতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, বোর্ড অব পিসের সদস্য কারা হবেন, তা নিজেই ঠিক করেছেন ট্রাম্প। গত বুধবার সম্ভাব্য সদস্যদের এ নিয়ে আমন্ত্রণপত্রও পাঠানো হয়েছে।
এই বোর্ডের অধীন গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রথমে গাজাবাসীর জন্য জরুরি ত্রাণের ব্যবস্থা করবে বলে জানান প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রধান আলী শায়াথ। ওয়েস্ট ব্যাংক রেডিও স্টেশন নামের একটি সম্প্রচারমাধ্যমে তিনি বলেন, গাজা পুনর্গঠনে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে না। যদিও জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপত্যকাটিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোগুলো নতুন করে গড়ে তুলতে অন্তত ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ঢুকে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। ইসরায়েল থেকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় আড়াই শ জনকে। সেদিন থেকেই উপত্যাটিতে নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজায় ইসরায়েল জাতিগত নিধন চালিয়েছে বলে অভিযোগ জাতিসংঘের।
এরই মধ্যে হামাস ও ইসরায়েলের সমঝোতায় শুরু হয় যুদ্ধবিরতি প্রথম ধাপ। এরপর দ্বিতিয় ধাপ নিয়ে গতকাল কায়রোয় হামাস ও বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠনের যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র। এর আগে হামাস জানিয়েছিল, কেবল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলেই, অস্ত্র ত্যাগে রাজি হবে তারা।
এ বিষয়ে উইটকফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো গাজায় হামাসের বিকল্প একটি শক্তি গড়ে তোলা, যারা শান্তি চায়। এ বিকল্প শক্তি হিসেবে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এই প্রশাসন এখন হামাসের সঙ্গে পরবর্তী ধাপের বিভিন্ন শর্ত নিয়ে আলোচনা করবে। এর একটি হলো নিরস্ত্রীকরণ। হামাস সদস্যদের ক্ষমার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হবে।