ইসরায়েলি সেনার গুলিতে নিহত হওয়া সাত মাস বয়সী ফিলিস্তিনি শিশুর বাবা ফাহ্দ আবু হাইকালের গাড়ির সামনের কাচে বুলেটের আঘাতের চিহ্ন। হেবরন, ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর। ৫ জুন, ২০২৬
ইসরায়েলি সেনার গুলিতে নিহত হওয়া সাত মাস বয়সী ফিলিস্তিনি শিশুর বাবা ফাহ্দ আবু হাইকালের গাড়ির সামনের কাচে বুলেটের আঘাতের চিহ্ন। হেবরন, ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর। ৫ জুন, ২০২৬

ইসরায়েলি সেনার গুলি বাবার হাত ভেদ করে কেড়ে নিল ৭ মাসের ফিলিস্তিনি শিশুর প্রাণ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে সাত মাস বয়সী একটি ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনারা। শিশুটি তার মা–বাবার সঙ্গে একটি গাড়িতে ছিল। ওই গাড়িতে গুলি চালানো হয়। শিশুটির বাবা বলেছেন, গুলি তাঁর হাত ভেদ করে তাঁর সন্তানের গায়ে বিদ্ধ হয়।

শুক্রবার হেবরন শহরের তেল রুমেইদা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সেনাদের নির্দেশ মেনে গাড়ি থামানোর পরও ওই পরিবারের গাড়িতে গুলি চালানো হয়।

সাত মাসের ওই শিশুর নাম সাম ফাহ্দ আবু হাইকাল। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে সে মারা যায়। তার মা–বাবাকেও আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সৈন্যরা এমন একটি গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল, যেটি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে বলে তারা মনে করেছিল, তবে প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে যে আহত ব্যক্তিরা সাধারণ বেসামরিক নাগরিক ছিলেন।

শিশুটির বাবা ফাহ্দ আবু হাইকাল বেথলেহেম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘একটি গুলি আমার হাত ভেদ করে ছেলের গায়ে লাগে। সাম তখন পেছনের সিটে তার মায়ের কোলে ছিল।’

আবু হাইকাল জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁরা গাড়ি নিয়ে হেবরন শহরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে তাঁদের ১১ বছরের আরেক ছেলে এবং আবু হাইকালের মা-ও ছিলেন। এমন সময় সেনারা তাঁদের গাড়ি থামাতে ইশারা করে।

তিনি আরও বলেন, তখনো দিনের আলো ছিল। যে সেনা গুলি ছুড়েছিল, সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল যে গাড়ির ভেতর একটি পরিবার বসে আছে।

হারেৎজকে তিনি বলেন, ‘এক সেনা আমাকে থামতে ইশারা করে। আমি পুরোপুরি গাড়ি থামাই এবং স্টিয়ারিং হুইলের ওপর দুই হাত তুলে রাখি। এর পরপরই তারা গাড়িতে গুলি চালাতে শুরু করে।’

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, তাদের সেনারা যখন দেখতে পায় যে একটি গাড়ি দ্রুতগতিতে তাদের দিকে আসছে এবং তখন একজন সেনা ‘গাড়িটি লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি ছোড়ে’।

সামরিক বাহিনীর এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন আবু হাইকাল।

তিনি হারেৎজকে বলেন, ‘সেনাটি আমার থেকে মাত্র ১০ মিটার দূরে ছিল। সে আমাকে, আমার স্ত্রীকে এবং বাচ্চাদের নিজের চোখে দেখেছে।’

‘গাড়ির কাচ কালো ছিল না। তখন দিনের আলো স্পষ্ট এবং সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আপনি বলতে পারবেন না যে সে একটি পরিবারকে দেখতে পায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্দেশ পাওয়ার পর আমি থেমেছিলাম। এরপরও তারা স্রেফ গাড়িতে গুলি চালিয়ে দেয়।’

আবু হাইকাল বলেন, ‘সেখানে কোনো নির্দিষ্ট চেকপোস্ট ছিল না, সেনারা শুধু রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে থামতে বলা হলে আমি থামি, আর তখনই গোলাগুলি শুরু হয়।’

এই ফিলিস্তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এর জন্য দায়ী সেনাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

‘আমি দাবি করি এবং আশা করি, যদি কোনো বিবেক, আইন বা নৈতিকতা অবশিষ্ট থাকে, তবে যে সেনা গুলি ছুড়েছে, তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তদন্ত ও বিচার ছাড়া এই মামলা কোনোভাবেই বন্ধ করা উচিত নয়। অন্ততপক্ষে আমি হাল ছাড়তে রাজি নই।’

এদিকে সাধারণ নাগরিকদের এমন ক্ষতির জন্য ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছে আইডিএফ। তারা বলছে, ‘ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

একই রকম আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল গত ১৫ মার্চ। উত্তর জর্ডান উপত্যকার তামৌন গ্রামে ইসরায়েলি সেনারা একটি গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল। এতে এক ফিলিস্তিনি দম্পতি এবং তাঁদের দুই শিশুসন্তান নিহত হয়।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন ৩৮ বছর বয়সী আলী বানি ওদেহ, তাঁর স্ত্রী ৩৬ বছর বয়সী ওয়াদ বানি ওদেহ এবং তাঁদের দুই ছেলে—ছয় বছরের উসমান ও পাঁচ বছরের মোহাম্মদ।

ইসরায়েলের মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম জানিয়েছে, ওই গাড়ি থেকে আরও দুই শিশুকে উদ্ধার করে সেনারা। তারা হলো ১১ বছরের খালেদ এবং ৮ বছরের মুস্তফা। তাদের উভয়েই স্প্লিন্টারের (বোমা বা গুলির উড়ন্ত টুকরা) আঘাতে সামান্য আহত হয়েছিল। সংগঠনটি জানায়, ঘটনার পরপরই সেনারা খালেদকে সেখানেই খুব কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

বি’তসেলেম আরও জানিয়েছে, সেনাবাহিনী প্রথমে সেখানে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে বাধা দেয়। অনেক দেরি হওয়ার পর চিকিৎসক দলকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠনটি জানায়, পরে সেনারা ওই পরিবারের গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়। গাড়িটিতে অসংখ্য গুলির গর্ত ছিল।

গত মাসে জাতিসংঘ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ২৪০ জনই শিশু। আর শুধু এই বছরেই নিহত হয়েছেন ৪৯ জন।