
ইরানের ওপর ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এমন হুমকি দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বেসেন্টের এ বক্তব্যের এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরুর হুমকি দেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া দেশগুলোকেও ‘অর্থনৈতিক পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের এসব হুমকির পর গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও এক দফা বেড়ে তিন সপ্তাহের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। এর মধ্যেই ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দেশটিকে আলোচনার টেবিলে এনে তাদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন।
বেসেন্ট মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে বলেন, ‘আমরা কেন সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হলে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান চালানোর আশঙ্কা কমে আসবে।’
ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালির অবরুদ্ধ করে রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে ইরান। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত।
যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এপ্রিলে ও জুনে দুবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে দুবারই অল্প সময়ের মধ্যে সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়।
নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত জানানো হবে সোমবার
ইরানের ওপর প্রায় ৫০ বছর ধরে একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দেশটি এসব নিষেধাজ্ঞার মুখে আছে।
বেসেন্টের বক্তব্যের আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করেছে। এসব নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনৈতিক সন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে তেহরান বলেছে, এতে ইরানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্পে সামান্যতম পরিবর্তনও আসবে না।
ইরানের ওপর প্রায় ৫০ বছর ধরে একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দেশটি এসব নিষেধাজ্ঞার মুখে আছে।
বেসেন্ট জানিয়েছেন, আগামী সোমবার সংবাদ সম্মেলনে নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত তুলে ধরবেন তিনি। কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সেদিন জানানো হবে। তিনি বলেন, ‘ইরানের ওপর আমাদের অবরোধ রয়েছে, এবার দেওয়া হবে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।’
ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধের কথাও উল্লেখ করেন বেসেন্ট। গত এপ্রিলে এই অবরোধ শুরু করা হয়েছিল। জুনের মাঝামাঝি এক মাসের জন্য তা স্থগিত রাখা হয়।
বেসেন্ট বলেন, ‘ইরানে এই নিষেধাজ্ঞা কাজে আসবে। আমরা তাদের সরকারকে পতনের দিকে নিয়ে যাব। এখন আমাদের মিত্র ও বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।’
চীনের ওপরও কি চাপ আসতে পারে
গবেষণা সংস্থা কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে চীন। ফলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার কারণে চীনের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে চীনের সঙ্গে নতুন করে অর্থনৈতিক সংঘাতে জড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চীন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানও রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার কারণে চীনকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, এ ধরনের অনেক আলোচনা প্রকাশ্যে না করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে করাই ভালো।
তবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস বলেছে, ‘নিষেধাজ্ঞা ও চাপ কোনো সমস্যার সমাধানে সহায়তা করে না।’ দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সংকটের সমাধান করা উচিত।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধের হুমকি
গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করা হবে এবং তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।
তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা কোন কোন দেশকে লক্ষ্য করা হবে, তা স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প। তাঁর হুমকির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোও পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব দেশের কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিতে মধ্যস্থতা করছে।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কোনো দেশ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা দিলে সেই দেশকেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
তবে এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য নিজ দেশে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এটি তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া।