
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির দপ্তর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে নতুন নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাবেক যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞ ব্যক্তি মোহসেন রেজায়িকে।
মোহসেন রেজায়ি ১৬ বছর ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ও তিনি বাহিনীটির কমান্ডার-ইন-চিফের দায়িত্বে ছিলেন। গত রোববার তাঁকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সেক্রেটারি (প্রধান) ও দেশটির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এ সংস্থায় মোজতবা খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
গতকাল সোমবার ইরানের সামরিক বাহিনীর আরও ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। ইরানের ‘যৌথ যুদ্ধ কমান্ড’-এর প্রধান আলী আবদুল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন চিফ অব স্টাফ করা হয়েছে। আলী ওজমাইকে দেওয়া হয়েছে আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব।
কট্টরপন্থী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকেও আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মোহাম্মাদ পাকপুরের স্থলাভিষিক্ত হলেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দফার হামলায় পাকপুর নিহত হন।
কট্টরপন্থী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদিকেও আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁকে ‘মেজর জেনারেল পদমর্যাদায়’ এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মোহাম্মাদ পাকপুরের স্থলাভিষিক্ত হলেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দফার হামলায় পাকপুর নিহত হন।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি বলেন, এসব নিয়োগের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবস্থান নরম হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
আজোদি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে খুব কমই সন্দেহ আছে যে খামেনি, ভাহিদি এবং আইআরজিসির নেতৃত্ব সবাই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয়।’
আজোদি বলেন, রেজায়ির প্রতিষ্ঠানিক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার থেকে শুরু করে সাধারণ সদস্যদের মধ্যেও তাঁর যথেষ্ট কর্তৃত্ব রয়েছে।
রেজায়ির এ নিয়োগের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সংহতি আরও জোরালো করা, সংগঠনটির ওপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা এবং এমন এক অভিজ্ঞ ব্যক্তির দক্ষতা কাজে লাগানো, যিনি আইআরজিসিকে আজকের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।সিনা আজোদি, জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক ব্লার্ব
আজোদি আরও বলেন, ‘তাঁর এ নিয়োগের উদ্দেশ্য মনে হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সংহতি আরও জোরাল করা, সংগঠনটির ওপর নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করা এবং এমন এক অভিজ্ঞ ব্যক্তির দক্ষতা কাজে লাগানো, যিনি আইআরজিসিকে আজকের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।’
রেজায়ি আগে এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সেক্রেটারি ছিলেন। এটি রাষ্ট্রের আরেকটি শীর্ষ সালিসি সংস্থা। ১৯৮০-এর দশকের ইরাক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেন। ওই দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
৭১ বছর বয়সী রেজায়ি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নেও ভূমিকা রেখেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইব্রাহিম রাইসির প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ে তাঁকে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের সমন্বয়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কখনো নির্বাচিত কোনো পদে দায়িত্ব পালন করেননি। রেজায়ি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও সফল হতে পারেননি।
জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নুরনিউজের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, রেজায়ির নিয়োগ ইরানের যুদ্ধকালীন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও বিস্তৃত ‘কৌশলগত পুনর্গঠন’ শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে সামরিক পোশাকে আবারও সামনে আসেন রেজায়ি। মোজতবা খামেনি তাঁর নিহত বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর রেজায়িকে সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা করা হয়।
ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনই আলী খামেনি নিহত হয়েছিলেন। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার ও অনলাইনে দেওয়া পোস্টে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার বার্তা দিয়ে আসছেন রেজায়ি।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা সমঝোতা স্মারকেরও (এমওইউ) বিরোধিতা করেন রেজায়ি। ওই সমঝোতার আওতায় সাময়িকভাবে ইরানের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং তেলবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিও আবার খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হয়।
রেজায়ির যুক্তি ছিল, তাঁর অবস্থান মোজতবা খামেনির অবস্থানের কাছাকাছি। শেষ পর্যন্ত কিছু আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মোজতবা খামেনি ওই সমঝোতায় অনুমোদন দেন।
গত জুলাইয়ের শুরুর দিকে সমঝোতাটি স্থগিত হওয়ার কিছুদিন আগে রেজায়ি বলেছিলেন, ‘যেসব বন্ধু আলোচনার বিরোধিতা করছেন, তাঁদের আমি অপেক্ষা করতে বলি। মার্কিনরা নিজেরাই এটি নষ্ট করে দেবে। তাঁরা আলোচনাকে কোনো ফলাফলে পৌঁছাতে দেবেন না।’ কিছুদিন পর আবার হামলা শুরু হলে সমঝোতাটি শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়।
দেড় বছরে পুরো বিশ্ব স্পষ্টভাবে দেখেছে, আমাদের দেশ ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি দেশ। এ কঠিন পরিস্থিতিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও বিজয়ের রহস্যও এটাই।ইসমাইল বাঘাই, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র
গত সপ্তাহে রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে তার আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। না হলে দেশটির সেনাদের গুরুতর ঝুঁকি ও প্রাণহানির মুখে পড়তে হবে। তিনি বলেন, ‘ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালিতে দ্বিতীয় কোনো করিডোর খোলার অনুমতি দেবে না।’
রাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ভোটাধিকার থাকা ১৩ সদস্যের ১২ জন ওই সমঝোতা স্মারকের পক্ষে ছিলেন। একমাত্র বিরোধিতা করেন অতি রক্ষণশীল নেতা সাঈদ জলিলি। তবে বেশ কয়েকজন কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা, গণমাধ্যম ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থক ওই সমঝোতার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র আরও ছাড় না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া উচিত ছিল না।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদে ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এ পর্ষদ সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজও করে। তবে যেকোনো সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে হয় সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরকে।
কয়েক দিন ধরেই স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়ে আসছিল, রেজায়ি শিগগিরই দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা পদে আসতে পারেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এ নিয়োগে আপত্তি জানাচ্ছিলেন। এর অংশ হিসেবে তিনি প্রথমে তৎকালীন নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মাদ বাঘের জোলঘাদরের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
রেজায়ির নিয়োগের তীব্র সমালোচনা করেছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রেজায়ি ও ভাহিদির বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ওই হামলায় ৮৫ জন নিহত হন। এ ঘটনায় তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধেই ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে।
জোলঘাদরও আইআরজিসির পুরোনো প্রজন্মের একজন সদস্য। তুলনামূলকভাবে কট্টরপন্থী হলেও তিনি বাস্তববাদী হিসেবে পরিচিত। তবে রেজায়ির তুলনায় তাঁর জ্যেষ্ঠতা ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কম। শেষ পর্যন্ত জোলঘাদরকে সরিয়ে রেজায়িকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। তবে জোলঘাদরকে সঙ্গে সঙ্গেই খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোজতবা খামেনিকেও জনসমক্ষে দেখা বা তাঁর বক্তব্য শোনা যায়নি।
আইআরজিসির আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের এক কর্মকর্তা এ সপ্তাহে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির তোলা নতুন কিছু ছবি শিগগিরই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেই বক্তব্য খণ্ডন করা হবে যে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হয়ে থাকতে পারেন। হামলায় তাঁর বাবা ও আইআরজিসির কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হন।
এ সপ্তাহে রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ মোজতবা খামেনির পুরোনো ও তারিখবিহীন একটি ভিডিও আবার প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে তাঁকে কয়েকজন ধর্মীয় নেতা ও অনুসারীর সঙ্গে এক বৈঠকে কথা বলতে দেখা যায়।
সোমবার পেজেশকিয়ানও বলেন, সম্প্রতি তিনি খামেনির সঙ্গে সাত ঘণ্টার একটি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সর্বোচ্চ নেতা ‘ঐক্যের’ ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নুরনিউজের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, রেজায়ির নিয়োগ ইরানের যুদ্ধকালীন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও বিস্তৃত ‘কৌশলগত পুনর্গঠন’ শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্পাদকীয়তে জোলঘাদরকে ব্যর্থতা বা অসন্তোষের কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা নাকচ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, সরকার রেজায়ির নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল, এমন দাবিও ঠিক নয়।
সম্পাদকীয়র ভাষ্য, রেজায়ি সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নীতির মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় করতে পারবেন। এর ফলে ‘আলাদাভাবে কাজ করার প্রবণতা’ বা সমন্বয়হীনতার সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
নুরনিউজ বলেছে, ‘মূল বিষয় একজন সেক্রেটারির (প্রধান) বিদায় বা আরেকজনের আগমন নয়। বরং এ নতুন পর্যায়ে (পরিবর্তিত ব্যবস্থাপনায়) নিরাপত্তা পর্ষদ সচিবালয় যে পদক্ষেপগুলো নেবে, সেগুলোর প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ বা ফলপ্রসূ হবে, সেটিই প্রকৃত বিষয়।’
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, জোলঘাদর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ফলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে, গালিবাফের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনা।
তবে সোমবার রেজায়িকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা দেওয়া জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে গালিবাফও ছিলেন। একইভাবে অভিনন্দন জানান ভাহিদি এবং নতুন করে বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পাওয়া গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই।
বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন ভাহিদি বলেন, নিরাপত্তা পর্ষদে রেজায়ির আগমন ‘যুদ্ধের ময়দান ও কূটনীতির মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় এগিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিরোধের নীতি এবং আশাবাদ জাগানো শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার মধ্যেও সমন্বয় তৈরি করতে পারে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রেজায়িকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বের বিষয়টি মনে রাখা জরুরি।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত দেড় বছরে পুরো বিশ্ব স্পষ্টভাবে দেখেছে, আমাদের দেশ ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি দেশ। এ কঠিন পরিস্থিতিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়িত্ব ও বিজয়ের রহস্যও এটাই।’
মার্কিনরা যদি ইরানের দিকে বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে চায় বা সামরিক হামলার (স্থল অভিযানের) কথা ভাবে, তবে তারা নিশ্চিত থাকতে পারে, প্রথম সপ্তাহেই আমরা অন্তত এক হাজার মার্কিন বন্দী করব। পরে তাঁদের প্রত্যেককে মুক্ত করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার করে দিতে হবে। এতে আমাদের অর্থনৈতিক অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।মোহসেন রেজায়ি, ইরানের নিরাপত্তা পর্ষদের নতুন প্রধান
রেজায়ির নিয়োগের তীব্র সমালোচনা করেছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রেজায়ি ও ভাহিদির বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ওই হামলায় ৮৫ জন নিহত হন। এ ঘটনায় তাঁদের দুজনের বিরুদ্ধেই ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ইরানি শাসকগোষ্ঠী “সন্ত্রাসবাদের পূজা” করে। এর পরিকল্পনাকারীদের পুরস্কৃত করে এবং ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের পদোন্নতি দেয়।’
রেজায়ির নিয়োগের পর অনলাইনে কিছু ইরানি ব্যবহারকারী তাঁর কয়েকটি বিতর্কিত মন্তব্যের কথা স্মরণ করেছেন। এসব মন্তব্য বছরের পর বছর ধরে গণমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়েছে।
এর মধ্যে একটি মন্তব্য রেজায়ি করেছিলেন ২০১৫ সালের জুলাইয়ে। এর কয়েক মাস পরই বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি হয়।
ওই চুক্তির আওতায় পরমাণু কর্মসূচিতে বিধিনিষেধ আরোপ করার বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। এর আগে রেজায়ি ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল হামলা হলে তা মোকাবিলার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে রেজায়ি বলেছিলেন, ‘মার্কিনরা যদি ইরানের দিকে বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে চায় বা সামরিক হামলার (স্থল অভিযানের) কথা ভাবে, তবে তারা নিশ্চিত থাকতে পারে, প্রথম সপ্তাহেই আমরা অন্তত এক হাজার মার্কিন বন্দী করব। পরে তাঁদের প্রত্যেককে মুক্ত করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার করে দিতে হবে। এতে আমাদের অর্থনৈতিক অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
রেজায়ির নিয়োগের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ইরাক যুদ্ধের সময়কার রেজায়ির কিছু দৃশ্যসহ একটি ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। সেখানে তাঁকে ‘দৃঢ় সামরিক চিন্তাধারার’ একজন কমান্ডার হিসেবে তুলে ধরা হয়।
তেহরানের বেশ কয়েকজন কট্টরপন্থীও নিরাপত্তা পর্ষদে এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। তাঁদের কাছে এমন একজন কট্টরপন্থী নেতা দায়িত্ব নিয়েছেন, যিনি সামরিক সংঘাতের ব্যাপারে ভীত নন। তাঁদের কেউ কেউ এমন রদবদলকে ব্যবহার করে পেজেশকিয়ানের চুক্তিপন্থী সরকারের সমালোচনাও করেছেন।
অতি রক্ষণশীল নেতা সাঈদ জলিলির ‘পায়দারি ফ্রন্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা আমির হোসেইন সাবেতি বলেন, ‘সর্বোচ্চ নেতা মোহসেন রেজায়িকে পর্ষদে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন, এ কথা প্রকাশ্যে আসার পর আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। জোলঘাদরের জায়গায় রেজায়িকে বসানোর বিষয়ে (উদারপন্থী) পেজেশকিয়ান দীর্ঘদিন ধরে নেতার বিরোধিতা করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থী সর্বোচ্চ নেতার (মোজতবা) ইচ্ছারই জয় হয়েছে।’