ইরানে বিক্ষোভ ঘিরে নিহত বেড়ে ৫ হাজার

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অন্তত ৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। ইরানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, বিক্ষোভের সময় ‘সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র দাঙ্গাবাজেরা নিরীহ ইরানিদের’ ওপর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল।

অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে সেখান থেকে সরকার পতনের ডাক দেওয়া হয়। বিক্ষোভ তীব্র হলে ৮ জানুয়ারি ইন্টারনেট বন্ধ করে মাঠে নামানো হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। যদিও ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে সে সময় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।

এরই মধ্যে গতকাল রোববার রয়টার্সকে ৫ হাজার জনের প্রাণহানির তথ্যের সত্যতা পাওয়ার কথা জানান ইরানের ওই কর্মকর্তা। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বিক্ষোভে সবচেয়ে বড় সংঘাতের কিছু ঘটনা ঘটেছে উত্তর-পশ্চিম ইরানের কুর্দিশ অঞ্চলে। সেখানে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের চূড়ান্ত সংখ্যা ৫ হাজারের খুব বেশি হবে না বলে আশা ওই কর্মকর্তার।

‘ইসরায়েল ও বিদেশি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর’ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করেছে এবং অস্ত্র দিয়েছে বলে দাবি করেন ইরানের ওই কর্মকর্তা। শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও বলেছিলেন, তাঁর দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দায়ী। বিদেশি অপরাধীদের বিনা শাস্তিতে পার পেতে দেবেন না—এমন হুঁশিয়ারও দেন তিনি।

ইরানি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ ইরানে বিক্ষোভ ঘিরে নিহতদের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য দিয়েছিল। শনিবার তারা জানায়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৩ হাজার ৩০৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পেরেছে তারা। আরও ৪ হাজার ৩৮২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

‘ইরানে নতুন নেতা খোঁজার সময় হয়েছে’

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানের বিক্ষোভের জন্য শুধু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দোষারোপ করেননি খামেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একজন ‘ক্রিমিনাল’ বলেও উল্লেখ করেন। পরে এক্সে আরেকটি পোস্টে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, সহিংস গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। এটি ‘জঘন্য অপবাদ’।

খামেনির এই পোস্টগুলো সম্পর্কে অবগত আছেন বলে শনিবার সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। খামেনির ৩৭ বছরের শাসনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ইরানের নতুন নেতা খোঁজার সময় হয়েছে। তেহরানের শাসকেরা দমন-পীড়ন ও সহিংসতার ওপর ভর করে দেশ শাসন করে আসছেন বলে উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

সাক্ষাৎকারে খামেনিকে ইরান ‘ধ্বংস’ করার জন্য দায়ী করেন ট্রাম্প। বলেন, তিনি (খামেনি) ইরানে এমন মাত্রার সহিংসতা ব্যবহার করেছেন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এরপর নিজের দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের নেতৃত্বের উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে আমি যেভাবে চালাই, সেভাবে নিজের দেশ পরিচালনায় মনোযোগ দেওয়া। নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে নয়।’

পলিটিকোর কাছে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি তেহরান। ইরানের বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে তেহরানকে একের পর এক হুমকি দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। যদিও সম্প্রতি তাঁকে সুর নরম করতে দেখা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, তেহরান হত্যাকাণ্ড বন্ধ করেছে এবং বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডও দেবে না। এ জন্য ইরানকে ‘ধন্যবাদ’ জানান তিনি।

গ্রেপ্তার ২৪ হাজার

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জানুয়ারির পর থেকে ইরানে বিক্ষোভ কমে আসায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডও দেবে না তেহরান। যদিও বিক্ষোভের সময় হাজার হাজার ‘দাঙ্গাবাজ ও সন্ত্রাসীকে’ গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। এইচআরএএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে তেহরান।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অনেকেকে ‘চক্রের নেতা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোয়। যেমন নাজানিন বারাদারান নামের এক নারী। তিনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভির অধীনে কাজ করেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। বিক্ষোভে নাজানিন নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগ তেহরানের।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রেজা পাহলভি ইরানে বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছিলেন। সরকার পতন হলে ইরানের নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তিনি। ইসরায়েলও তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। যদিও রয়টার্সকে সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, পাহলভিকে দেখে ভালোই মনে হয়। তবে ইরানের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো জনসমর্থন তাঁর আছে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।