মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬
মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬

মক্কা চুক্তিতে মিসরকে যুক্ত করতে রাজি নয় সৌদি, কিন্তু কেন তারা সিসি সরকারের ওপর বিরক্ত

তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব। মিসরকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে তুরস্ক জোর দিলেও সৌদি আরব এতে রাজি হয়নি। ওই আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনটি সৌদি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে এ কথা জানিয়েছেন।

ওই সব সূত্রের একজন সৌদি রাজপরিবারের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, রিয়াদ চায়নি মিসর ‘অন্তত এখনই’ এই চুক্তিতে যোগ দিক।

বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় তিন সৌদি কর্মকর্তার কেউ-ই নাম প্রকাশে রাজি হননি। তাঁরা প্রত্যেকে বলেছেন, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি অসন্তোষ থেকেই সৌদি আরব এমন অবস্থান নিয়েছে। রিয়াদের ধারণা, একসময় মিসরের যে কৌশলগত ও সামরিক গুরুত্ব ছিল, তা এখন আর নেই।

মুসলিমদের পবিত্র নগরী মক্কায় গত শুক্রবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সৌদি কর্মকর্তারা একে যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের একটি ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে, কোন পরিস্থিতিতে এটি কার্যকর হবে এবং সংকটের সময় যৌথ সামরিক সহায়তা কীভাবে দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

সূত্রগুলোর মতে, মিসরকে এ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতার পেছনে রিয়াদ ও কায়রোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনাও ভূমিকা রেখেছে।

কর্মকর্তারা বলেন, মিসরে ২০১৩ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিসি ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় আর্থিক সমর্থক ছিল সৌদি আরব। তবে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে মিসরের কাছ থেকে পাল্টা সমর্থন না পাওয়ায় সৌদি আরব ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়েছে।

সৌদি সূত্রগুলো বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি কায়রোর ‘নির্ভরশীলতা’ নিয়েও রিয়াদের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আবুধাবির সমর্থন দেওয়া নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

রিয়াদের মতে, এসব গোষ্ঠী সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

তিনটি সূত্রের মধ্যে দুটি সূত্র বলছে, ইরানের হামলার জবাবে মিসর আবুধাবিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে সিসি একাধিকবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।

সৌদি সূত্রগুলো বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি কায়রোর ‘নির্ভরশীলতা’ নিয়েও রিয়াদের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আবুধাবির সমর্থন দেওয়া নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রিয়াদের মতে, এসব গোষ্ঠী সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে মিসর এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তাঁদের মতে, এতে আবুধাবির সঙ্গে সিসির ঘনিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে রিয়াদ ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।

সূত্রগুলো আরও বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কয়েকটি নীতিকে মিসরের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের বিরোধী বলে মনে করে রিয়াদ। এর মধ্যে আছে—সোমালিল্যান্ডে আমিরাতের ভূমিকা, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক, গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ বাঁধ নিয়ে বিরোধের সময় ইথিওপিয়াকে সমর্থন এবং সুদানে র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সহায়তা।

একটি সূত্র বলেছে, এসব বিষয় সত্ত্বেও কায়রোর সঙ্গে আবুধাবির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় থাকায় রিয়াদের উদ্বেগ বেড়েছে। কৌশলগত অংশীদার হিসেবে মিসর কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে রিয়াদের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।

আরেকটি সূত্র বলেছে, সিসির আমলে সৌদি আরব ক্রমেই মিসরকে নির্ভরযোগ্য অংশীদারের বদলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

সৌদি রাজপরিবারের সাবেক ওই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই মিসর সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বিনিময়ে তারা খুব কমই দিয়েছে।

সাবেক উপদেষ্টা বলেন, ‘মিসর সব সময়ই আমাদের ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তারা বিনিময়ে কিছু দেয় না। শুধু নিয়েই যায়, কিন্তু কোনো প্রতিদান দেয় না।’

চুক্তিতে মিসরকে যুক্ত করতে চেয়েছিল তুরস্ক

গত শনিবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইঙ্গিত দেন, কারিগরি কিছু বিষয়ের সমাধান হলে ভবিষ্যতে মিসরের এই জোটে যোগ না দেওয়ার কোনো কারণ নেই।

তুরস্কের একাধিক সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেছে, মিসরকে এই চুক্তিতে যুক্ত করতে আঙ্কারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল এবং দেশটির অংশগ্রহণের প্রস্তাবও আনুষ্ঠানিকভাবে দিয়েছিল।

তবে তুর্কি সূত্রগুলোর মতে, কায়রো চুক্তিতে যুক্ত হতে প্রস্তুত নয় বলে নিশ্চিত হওয়ার পর অন্য দেশগুলো মিসরকে ছাড়াই চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে মিসর নিজেই চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেছে কি না, সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন সৌদি কর্মকর্তারা।

সৌদি রাজপরিবারের সাবেক ওই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার সঙ্গে এখনো দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের ঘনিষ্ঠতা আছে। তিনি বলেন, কায়রো নিজেই এই চুক্তিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ‘হাস্যকর’।

কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহযোগী ছিল মিসর। ১৯৯১ সালে কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটেও মিসর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সূত্রগুলোর মতে, পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। একসময় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মিসরের সঙ্গে সামরিক জোটে থাকা কুয়েত এখন মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতেই বেশি আগ্রহী।

ওই উপদেষ্টা বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, সিসি এই চুক্তিতে যোগ দিতে আগ্রহীই হতেন, যদি তিনি বরাবরের মতো এ চুক্তি থেকে আর্থিক সুবিধা নিতে পারতেন।’

উপদেষ্টার মতে, সিসির আনুগত্য নিয়ে সৌদি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সন্দেহ আছে। তাঁরা মনে করেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতৃত্বের ওপর যতটা আস্থা রাখা যায়, ততটা আস্থা সিসির ওপর আস্থা রাখা যায় না।

অন্য সূত্রগুলো বলছে, সামরিক দিক থেকে এই জোটে মিসরের তুলনায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের দেওয়ার মতো বেশি কিছু আছে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষাশিল্প ক্রমেই আধুনিক ও উন্নত হচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত অস্ত্র উৎপাদন খাত এবং বড় ধরনের সামরিক শক্তি আছে।

সূত্রগুলোর দাবি, মিসরের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই বেসামরিক পণ্য উৎপাদনের দিকে কেন্দ্রীভূত। অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দেশটি তুরস্ক বা পাকিস্তানের সমপর্যায়ের নয়।

সূত্রগুলো মিসরের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি ও কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের মতে, শুধু মিসরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নয়; বরং নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোয় কায়রো বাস্তবে কী অবদান রাখতে পারবে, সেটিও রিয়াদ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে।

মিসরের ক্রমশ কমে আসা ভূমিকা

সৌদি আরবের এই মূল্যায়ন এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে মিসরের ক্রমশ কমে আসা ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

দ্য ইকোনমিস্ট গত সোমবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, একসময় নিজেকে আঞ্চলিক ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরা মিসর এখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ও সামরিক শক্তি—দুই ক্ষেত্রেই ক্রমাগত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহযোগী ছিল মিসর। ১৯৯১ সালে কুয়েত থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটেও মিসর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সূত্রগুলোর মতে, পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। একসময় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মিসরের সঙ্গে সামরিক জোটে থাকা কুয়েত এখন মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতেই বেশি আগ্রহী।

সৌদি সূত্রগুলোর দাবি, সিসির আমলে মিসর বড় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে তুলনামূলক কম অবদান রেখেছে। তারা বাইরের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

তবে তিনটি সূত্রই জোর দিয়ে বলেছে, ভবিষ্যতে মিসরের এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে আপাতত রিয়াদের অবস্থান হলো, মিসরকে চুক্তির বাইরে রাখা।