ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকার কয়েকটি ভবন
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকার কয়েকটি ভবন

বিশ্লেষণ

খামেনিকে হত্যার পর ইরানের ভবিষ্যৎ কী

কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তিনি কেবল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বই দেননি, বরং এই রাষ্ট্রের চেহারাও ঠিক করে দিয়েছিলেন।

হামলার জবাবে তেহরান দৃশ্যত চারদিকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মুখে পড়েছে।

চলমান এই ঝড়ের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের সাধারণ মানুষ। গত ডিসেম্বরে হাজার হাজার ইরানি রাস্তায় নেমে আসেন। সরকার কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিক্ষোভের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ‘সাহায্য আসছে’। তবে খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের জনগণের ভবিষ্যৎ এখন আরও বেশি বিপজ্জনকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়।

গত শনিবার ইরানের জনগণের উদ্দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘আপনাদের মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। এটি আপনাদেরই প্রাপ্য। সম্ভবত কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটিই আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’

তবে ইরানের বিরোধী শিবিরের বিভিন্ন পক্ষের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো—মার্কিন নাগরিকেরা খামেনিকে সরিয়ে দিলেও কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন (রেজিম চেঞ্জ) সম্ভব নয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতে, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু ইরানিদের জন্য ‘নিজেদের দেশ ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ’। তবে তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশেষ করে গত জুনে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ধাপের হামলার পর থেকে প্রকৃত ক্ষমতা মূলত ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ এবং ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি)’ হাতে চলে গেছে।

ফলে এই যৌথ অভিযান শেষ হওয়ার পর ইরানে একটি দুর্বল ও ক্ষতবিক্ষত কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ শাসনব্যবস্থা থেকে যেতে পারে। তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে এবং ট্রাম্পের উসকানিতে সাড়া দেওয়ার সাহস দেখালে সাধারণ মানুষকে দমনে আরও মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।

বিকল্প নেতৃত্ব নেই

ইরানের তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলার পর একটি স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠছে। ১ মার্চ ২০২৬

বিক্ষোভ দমনে রক্তক্ষয়ী অভিযানের কারণে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়া এবং কোনো সুনির্দিষ্ট নেতা বা বিকল্প নেতৃত্ব না থাকাটাও বড় প্রতিকূলতা। যদিও কোনো কোনো বিক্ষোভকারী ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি তুলেছিলেন। ওই বিপ্লবের মাধ্যমেই বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল।

এমনকি ইরানি কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতো যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলার সমর্থক, তারাও এখন উদ্বিগ্ন। দেশটিতে তাদের হাতেগোনা কিছু সংগঠিত সশস্ত্র বিরোধী শক্তি রয়েছে (বলে রাখা ভালো, তারা রাজতন্ত্র ফেরার পক্ষে নয়)।

কুর্দি জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির (পিএকে)’ সদস্য হানা ইয়াজদানপানা বলেন, ‘অবশ্যই এই হামলাগুলোকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। কিন্তু অতীতে জনগণকে রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে তারা অনেকটা মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। আমাদের এখন সেই আশা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।’

মূলত সমস্যাটি এখানেই। বাইরের সামরিক চাপ একটি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারলেও তা খুব কম সময়ই একটি টেকসই ও স্থিতিশীল বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে; বরং অন্তর্বর্তীকালীন এই রূপান্তর পর্বটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

‘ভাগ করো, শাসন করো নীতি’ ইতিহাসবিদ এবং ‘হোয়াট ইরানিয়ানস ওয়ান্ট (ইরানের মানুষ যা চায়)’ গ্রন্থের লেখক আরাশ আজিজি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে ইরানের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা, এমনকি গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার মতো বড় বিপদ রয়েছে। এমনটি হলে সেটি হবে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন।’

আর এই পর্যায়ে এটিই হয়তো মূল লক্ষ্য। ইসরায়েলের ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতির একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে—ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সিরিয়া পর্যন্ত। সিরিয়ার দক্ষিণে উত্তেজনা উসকে দিয়ে ইসরায়েল দেশটির নতুন প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যিনি দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদকে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়টি তদারকি করেছিলেন।

শনিবার রাতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের নাগরিকদের ‘দলে দলে রাজপথে নেমে আসতে এবং সরকার পরিবর্তনের কাজটি শেষ করার’ আহ্বান জানান। তবে শঙ্কার বিষয় হলো, ইসরায়েলের কাছে একটি শক্তিশালী, পশ্চিমামুখী ও সমৃদ্ধ ইরানের চেয়ে একটি দুর্বল, অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল ইরানই বেশি পছন্দনীয় হতে পারে।

বাইরের প্রভাব বাদ দিলেও শাসনব্যবস্থার ইস্পাতকঠিন কাঠামো ‘আইআরজিসি’কে মোকাবিলা করার বিষয় রয়েছে। এত শক্তিশালী, সুসজ্জিত ও গভীরভাবে গেঁথে থাকা একটি বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়া কেবল এক দফা বিমান হামলার মাধ্যমে সম্ভব নয়।

আরাশ আজিজি বলেন, প্রকৃত ক্ষমতা এখন ইরানের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা কাউন্সিলের হাতে, যারা ‘গত জুন থেকে কার্যত দেশ চালাচ্ছে’। তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে এখন ক্ষমতার লড়াই শুরু হবে।’

আরাশ আজিজি বলেন, তেহরানে যাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে আসবেন, টিকে থাকার স্বার্থে তাঁদের হয়তো নতুন করে সব সাজাতে হবে। কট্টর আদর্শিক আমেরিকা-বিরোধিতা ও ইসরায়েল-বিরোধিতা কি সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গেই সমাহিত হবে? এটি কি নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান ও সাবেক আইআরজিসি কর্মকর্তা আলী লারিজানির মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির পথ প্রশস্ত করবে?

ইতিহাসবিদ আরাশ আজিজি আরও প্রশ্ন তোলেন, এতে কি তারা (যুক্তরাষ্ট্র) সন্তুষ্ট হবে? নাকি তারা সত্যিই তাদের নিজেদের কথায় বিশ্বাস করে যে ইরানি জনগণ এখন ক্ষমতা দখলের জন্য জেগে উঠবে অথবা রেজা পাহলভির মতো কোনো বহিরাগত ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে?

[ইনডিপেনডেন্টে প্রকাশিত বিশ্লেষণটি লিখেছেন সংবাদমাধ্যমটির চিফ ইন্টারন্যাশনাল করেসপনডেন্ট বেল ট্রিউ)