
শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি সচল করতে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মিত্রদের সহায়তা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আরব কর্মকর্তারা এমনটা জানিয়েছেন। এ পদক্ষেপের ফলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আমিরাত হবে প্রথম দেশ, যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর আমিরাতে বিভিন্ন মার্কিন অবস্থানে পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছে ইরান।
কর্মকর্তারা বলেন, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপের বৈধতা পেতে আরব আমিরাত বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবের জন্য তদবির করছে।
আমিরাতের এক কর্মকর্তা জানান, তাঁদের কূটনীতিকেরা যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপ ও এশিয়ার সামরিক শক্তিগুলোকে একটি জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে শক্তি প্রয়োগ করে প্রণালিটি সচল রাখা যায়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরান মনে করছে যে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে এবং এ জন্য তারা হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতেও প্রস্তুত।
আমিরাতি ওই কর্মকর্তা আরও জানান, তাঁর দেশ বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিকভাবে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তা সক্রিয়ভাবে পর্যালোচনা করছে। এর মধ্যে সমুদ্র থেকে মাইন অপসারণ এবং অন্যান্য সহায়তা প্রদানের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কয়েকজন আরব কর্মকর্তা বলেন, এই কৌশলগত জলপথের অন্তর্ভুক্ত ‘আবু মুসা’ দ্বীপসহ অন্য দ্বীপগুলো দখলে নেওয়া উচিত বলে যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছে আমিরাত। উল্লেখ্য, অর্ধশতাব্দী ধরে আবু মুসা দ্বীপটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আমিরাত এটিকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে।
এক বিবৃতিতে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের শহরগুলোয় ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে গৃহীত জাতিসংঘের একটি পৃথক প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টার যে নিন্দা জানানো হয়েছে, সেটিও তারা মনে করিয়ে দিয়েছে।
আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে, এ বিষয়ে একটি ব্যাপক বৈশ্বিক ঐকমত্য রয়েছে।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে উপসাগরীয় দেশগুলো
সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আরব কর্মকর্তারা বলেন, দেশগুলো চায় ইরান সরকারকে অচল বা ক্ষমতাচ্যুত না করা পর্যন্ত এ যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক। তবে এখন পর্যন্ত তারা সরাসরি নিজেদের সামরিক বাহিনী মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের স্বাগতিক দেশ বাহরাইন এ–সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপন করেছে। ওই প্রস্তাবের ওপর আজ বৃহস্পতিবার ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে।
সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এখন ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আরব কর্মকর্তারা বলেন, দেশগুলো চায় ইরান সরকারকে অচল বা ক্ষমতাচ্যুত না করা পর্যন্ত এ যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক। তবে এখন পর্যন্ত তারা সরাসরি নিজেদের সামরিক বাহিনী মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
পারস্য উপসাগরীয় একটি দেশের কর্মকর্তারা বলেন, আমিরাতের এই নতুন ও কঠোর অবস্থান দেশটির কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে ইরান সরকারকে অর্থায়নে সহায়তা করে আসছিল আমিরাতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাই। এমনকি যুদ্ধ শুরুর আগে আমিরাতের কূটনীতিকেরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার জন্য দৌড়ঝাঁপও করেছিলেন। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের সেক্রেটারি আলী লারিজানি আবুধাবি সফর করেছিলেন। পরে চলমান যুদ্ধে এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
বর্তমানে এই উপসাগরীয় দেশ যুদ্ধে মিত্রদের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি সচল করার ক্ষেত্রে।
এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আবার সচল না করেই তিনি যুদ্ধের ইতি টানতে রাজি আছেন এবং বিষয়টি তিনি অন্য দেশগুলোর ওপর ছেড়ে দিতে চান।
‘বড় ধরনের ঝুঁকি’
হরমুজ প্রণালি মুক্ত করার অভিযানে আমিরাতের অংশগ্রহণে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিলে দেশটিকে যুদ্ধের পরও দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
এরই মধ্যে আরব আমিরাতের ওপর হামলার তীব্রতা বাড়িয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইরান। কয়েক সপ্তাহ ধরে হামলার মাত্রা কম থাকলেও সম্প্রতি আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবারই ছোড়া হয়েছে প্রায় ৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন।
তেহরান সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, কোনো উপসাগরীয় দেশ যদি ইরানের ভূখণ্ড দখলের অভিযানে সাহায্য করে, তাহলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। বিশেষ করে আমিরাতকে ইঙ্গিত করে এ হুমকি দেওয়া হয়।
এ অঞ্চলের দেশগুলোর দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থার বিষয়ে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির ফেলো এবং পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা এলিজাবেথ ডেন্ট বলেন, ‘তারা (আমিরাত) এমন এক সময়ে যুদ্ধে জড়াচ্ছে, যখন আরও বেশি আক্রমণাত্মক ইরানকে মোকাবিলা করতে হবে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় যে নিয়মিত আঘাত আসছে, তা হজম করত হচ্ছে।’
এলিজাবেথ ডেন্ট আরও বলেন, ‘বিশেষ করে, যদি ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি সচল করা বা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন–সক্ষমতা ধ্বংস করার আগেই যুদ্ধে জয় ঘোষণা করেন, তাহলে এই প্রতিবেশীর সঙ্গে আবার সম্পর্ক স্থাপন করা আমিরাতের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।’