
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক শক্তিতে জেতার চেয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশলে বাজি ধরছে ইরান। তেহরানের লক্ষ্য স্পষ্ট—সরাসরি সংঘাত নয়; বরং ‘টিকে থাকার এক নির্মম যুদ্ধে’ প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা।
ইরানের এই কৌশলের মূলে রয়েছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে ভীতি ছড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া। বিশ্ববাজারে জ্বালানিসংকটের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে বাধ্য করাই এখন তেহরানের প্রধান চাল।
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় বড় ধাক্কা এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পরও ময়দানে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির এই প্রধান প্রতিরক্ষা বাহিনী বর্তমানে যুদ্ধের গতি–প্রকৃতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। পূর্বপরিকল্পিত সব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি হামলার লক্ষ্যবস্তু এবং যুদ্ধের সামগ্রিক কৌশল এখন তাদের নির্দেশেই নির্ধারিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলাতেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আসীন করার ক্ষেত্রেও আইআরজিসি চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, ‘ইরানের জন্য এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তারা একে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবেই দেখছে। তাদের ধারণা, এখন তাদের টিকে থাকাই সংকটের মুখে। আর তাই তারা সবকিছু ধ্বংস করে দিতেও পিছপা হবে না।’
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও ইরানের রাজনীতিবিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ভাতানকা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, ‘তারা আহত হওয়ার কারণে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক।’
পুরোদমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এই মানসিকতা থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান তাদের হামলার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। কাতার থেকে সৌদি আরব—সব দেশেরই জ্বালানিকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে তেহরান। তাদের এই কৌশলী পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানো। এর মাধ্যমে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায়, যাতে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ধৈর্য ও সাহসের পরীক্ষা নেওয়া যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের বলেন, ইরান ‘পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে পরাজিত’ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে। তবে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন—যুদ্ধ খুব শিগগির শেষ হবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান শেষ হলে তেহরানের কাছে এমন কোনো অস্ত্র অবশিষ্ট থাকবে না, যা দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা মার্কিন মিত্রদের ওপর আঘাত হানতে পারে। অন্তত দীর্ঘ সময়ের জন্য তারা এই সক্ষমতা হারাবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, যুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই তারা এমন পরিস্থিতির আভাস পেয়েছিল। ইরানের নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের সঙ্গে এই সংঘাত এড়ানো অসম্ভব। আর তাই আইআরজিসির বিশাল সামরিক নেটওয়ার্ক এবং প্রক্সি বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে তারা আগে থেকেই একটি বহুমুখী রণকৌশল তৈরি করে রেখেছিল।
সূত্রগুলো বলছে, এখন হারাবার মতো আর তেমন কিছু নেই ইরানের কাছে। তাই তারা সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নেই নেমেছে। এই সংঘাতকে তারা এখন এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপ দিচ্ছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই পরিবর্তনের হাওয়া দৃশ্যমান। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে—রাষ্ট্রক্ষমতায় এখন আইআরজিসিই মূল নিয়ন্ত্রক। ধর্মীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব এখন সম্পূর্ণভাবে আইআরজিসির ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে যুদ্ধে অর্থনীতি সচল রাখতে বন্দরে পণ্য খালাসের জটিলতা কমিয়ে আনা হয়েছে। তেহরানের একটি সূত্র জানায়, মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণের মধ্যেও জনজীবন থমকে যায়নি। দোকানপাট ও ব্যাংক খোলা রয়েছে। এমনকি অবকাঠামোতে হামলার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের জাতীয় সংহতি দেখা যাচ্ছে।
ওই সূত্র বলে, ‘মানুষ ইরানকে ভেঙে টুকরা হয়ে যেতে দেখতে প্রস্তুত নয়।’
আপাতত জনমানুষের এই আবেগ ইরান সরকারকে কিছুটা সময় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কত দিন চলবে এই লড়াই
কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের মোহান্নাদ হাজ আলীর মতে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার আর কত দিন টিকে থাকবে?
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের মজুতের বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, তেহরানের কাছে এখনো অর্ধেকের বেশি মজুত থাকতে পারে। এই হিসাব সঠিক হলে ইরান আরও কয়েক সপ্তাহ হামলা চালিয়ে যেতে পারবে, যা ওয়াশিংটনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হবে।
কে হার মানবে আগে
অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, ‘বড় প্রশ্ন হলো—কে আগে হার মানবেন? ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি ইরানের নেতারা?’ তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পশ্চিমা অর্থনীতিতে মন্দার ক্ষত ছড়িয়ে দিয়ে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে পিছু হটাতে চায়। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চাপের মুখে ট্রাম্প হয়তো ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা এবং সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের সাফল্যকে পুঁজি করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজবেন। তবে তেহরানের কাছে শুধু টিকে থাকাই হবে জয়। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ থেকে এক আহত ইরানের উত্থান ঘটতে পারে, যা বর্তমান শাসনব্যবস্থার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।