ইরাকের বাগদাদের আমেরিয়াহ এলাকায় ১৮ মার্চ রাস্তার পাশে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড দেখা যায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হন। বিলবোর্ডটিতে একজন ইরানি সেনার পেছনে খামেনিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা রয়েছে, ‘একজন শহীদই যুদ্ধক্ষেত্রের নেতৃত্ব দেন।’
ইরাকের বাগদাদের আমেরিয়াহ এলাকায় ১৮ মার্চ রাস্তার পাশে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড দেখা যায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হন। বিলবোর্ডটিতে একজন ইরানি সেনার পেছনে খামেনিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা রয়েছে, ‘একজন শহীদই যুদ্ধক্ষেত্রের নেতৃত্ব দেন।’

শীর্ষ নেতৃত্বকে হারানোর পর কারা এখন ইরান চালাচ্ছেন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনে ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডাররা নিহত হয়েছেন। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের আগ্রাসন শুরুর পর ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এখনো তাদের রণকৌশল প্রণয়ন ও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রেখেছে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লব থেকে জন্ম নেওয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একটি জটিল ও স্তরভিত্তিক শাসনকাঠামো গড়ে তুলেছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ওপর নির্ভর না করে বরং ধর্মতাত্ত্বিক এই শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই তাদের সব প্রতিষ্ঠান ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে।

ইরানের ক্ষতবিক্ষত কিন্তু অবিচল এই ক্ষমতার স্তরে এখন কারা প্রভাব বিস্তার করছেন, সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

সর্বোচ্চ নেতাই কি সব নিয়ন্ত্রণ করছেন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের শুরুর দিকের হামলায় ইরানের প্রবীণ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা এই নেতার প্রতি পুরো ব্যবস্থার নিরঙ্কুশ আনুগত্য ছিল এবং সব বড় সিদ্ধান্তে শেষ কথাটি তিনিই বলতেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রধান উপদেষ্টা আলী লারিজানির মৃত্যু বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় ধাক্কা। বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে লারিজানি অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় আদর্শ ‘বেলায়াত-ই ফকিহ’ বা ‘ইসলামি আইনবিদের শাসন’ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হলেন একজন বিজ্ঞ আলেম। তিনি শিয়া ইসলামের নবম শতাব্দীতে অন্তর্হিত হওয়া ‘দ্বাদশ ইমাম’-এর প্রতিনিধি হিসেবে পার্থিব ক্ষমতা পরিচালনা করেন।

সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর ‘বাইত’ নামে পরিচিত। এখানকার বিশাল জনবল ইরান সরকারের প্রতিটি স্তরের ওপর ছায়ার মতো নজর রাখে। এর ফলে সর্বোচ্চ নেতা সরাসরি আমলাতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পান।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

নতুন নেতা হিসেবে মোজতবা আলী খামেনি তাঁর বাবার উত্তরাধিকার ও ব্যাপক আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা লাভ করেছেন। তবে তাঁর বাবার মতো প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব মোজতবার নেই। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পছন্দের ব্যক্তি হওয়ায় তিনি হয়তো এই কট্টরপন্থী সামরিক বাহিনীর কাছে দায়বদ্ধ।

ইসরায়েলি হামলায় মোজতবা নিজেও আহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁকে বর্তমান যুদ্ধের একজন ‘জানবাজ’ বা আহত যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ইরানিরা এখনো তাঁর কোনো ছবি বা ভিডিও দেখেনি। তিনি কেবল দুটি লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কতটা প্রভাবশালী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী

বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রভাব কয়েক দশক ধরেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে বর্তমান যুদ্ধ এবং আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ায় এই বাহিনী এখন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়েও বেশি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে গেলেও জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় পেজেশকিয়ান এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তবে চলতি মাসের শুরুতে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানি হামলার জন্য ক্ষমা চেয়ে তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তোপের মুখে পড়েন এবং পরে নিজের বক্তব্য আংশিক প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

নেতৃত্বের শূন্যতা মোকাবিলায় বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিশেষ একটি ‘মোজাইক’ বা বহুমুখী সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। এ ব্যবস্থায় প্রতিটি কমান্ডারের বিকল্প উত্তরসূরি আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। ফলে যুদ্ধের ময়দানে প্রতিটি ইউনিট নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম।

গত এক বছরে অনেক শীর্ষ কমান্ডার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় নিহত হলেও তাঁদের জায়গায় দ্রুত অন্য অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মূলত ১৯৮০-৮৮ সালের ইরাক যুদ্ধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে কয়েক দশকের সম্পৃক্ততা এই বাহিনীকে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কী

ইরানের শাসনব্যবস্থায় ধর্মীয় শাসনের পাশাপাশি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলত বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে মিলেই তারা দেশ পরিচালনা করে থাকে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রধান উপদেষ্টা আলী লারিজানির মৃত্যু বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড় এক ধাক্কা। বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে লারিজানি অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন।

তবে লারিজানির শূন্যস্থানে এখন যিনি আসছেন, তিনি নিহত নেতাদের তুলনায় আরও বেশি কট্টরপন্থী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এখনো অনেক অভিজ্ঞ রাজনীতিক ইরানের শাসনব্যবস্থায় সক্রিয় রয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি

ইরানের বর্তমান ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা শীর্ষ ব্যক্তিত্ব কারা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা ও কমান্ডার নিহত হলেও দেশটির শাসনকাঠামোয় এখনো বেশ কিছু প্রভাবশালী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি সক্রিয় রয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—

বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান আহমদ ওয়াহিদি। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সর্বশেষ প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আহমদ ওয়াহিদি। তাঁর আগের দুজন প্রধান নিহত হওয়ার পর তিনি এ দায়িত্ব পান। কয়েক দশক ধরে প্রভাবশালী এই নেতা ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এর আগে তিনি কুদস ফোর্সের প্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

নাম রয়েছে কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানির। ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর তিনি কুদস ফোর্সের দায়িত্ব নেন। অন্তরালে থেকে কাজ করা এই কর্মকর্তা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখেন।

আলোচনায় আছেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌপ্রধান আলীরেজা তাংসিরি। ২০১৮ সাল থেকে তিনি এই পদে রয়েছেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের যে রণকৌশল, তাতে তাংসিরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ একজন কমান্ডার।

পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের নাম বলতেই হয়। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক এই কমান্ডার ও তেহরানের সাবেক মেয়র বর্তমানে ইরানের জীবিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি ইরানের অবস্থান তুলে ধরতে বেশ সোচ্চার রয়েছেন।

ইসরায়েলি একটি সূত্র ও সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতা করছেন।

বিচার বিভাগের প্রধান আয়াতুল্লাহ গোলাম হোসেইন মহসেনি-এজেইও এই সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। সাবেক এই গোয়েন্দাপ্রধান একজন কট্টরপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০০৯ সালে ইরানে গণবিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকা রাখার অভিযোগে তাঁর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান আহমদ ওয়াহিদি

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বর্তমান পরিস্থিতিতে জোরালো ভূমিকা রাখছেন। ইরানের শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আগের চেয়ে কমে গেলেও জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় পেজেশকিয়ান এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তবে চলতি মাসের শুরুতে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানি হামলার জন্য ক্ষমা চেয়ে তিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তোপের মুখে পড়েন। পরে তিনি নিজের বক্তব্য আংশিক প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটির সাবেক প্রধান সাইদ জলিলিও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের এই আহত যোদ্ধা ইরানের রাজনীতির অন্যতম কট্টরপন্থী মুখ। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হওয়া জলিলি এর আগে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে আপসহীন আলোচনার জন্য পরিচিত ছিলেন।

গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলীরেজা আরাফির নাম এবার সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আলোচনায় ছিল। এই জ্যেষ্ঠ আলেম গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন প্রভাবশালী সদস্য, যাঁরা নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা নির্ধারণ করে থাকেন। খামেনির মৃত্যুর পর গঠিত তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলেও তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরেক পরিচিত মুখ ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির এখনকার ভূমিকা অসামান্য। প্রবীণ এই কূটনীতিক দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের স্পর্শকাতর আলোচনা চালিয়ে আসছেন। পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও আরব দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করছেন।