
বাবাকে দাফন করে সবে বাড়ি ফিরেছেন মোহাম্মদ আসাসা। এমন সময় কয়েকটি শিশু দৌড়াতে দৌড়াতে এসে চিৎকার করে বলল, ‘অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা কবরটি খুঁড়ে ফেলছে।’
মোহাম্মদের বাবা হুসেইন আসাসার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। গত শুক্রবার তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। পশ্চিম তীরের জেনিনের কাছে আসাসা নামের ছোট্ট গ্রামে তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত মানুষ। গ্রামের নামটিও এই পরিবারের পদবি থেকেই এসেছে। সাবেক এই পশু ব্যবসায়ী ১০ সন্তানের বাবা ছিলেন। ইসলামি রীতি মেনে বাড়ির উল্টো দিকের ছোট টিলায় গ্রাম্য কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
মোহাম্মদ বলেন, কোনো সমস্যা যেন না হয়, সে জন্য তিনি কাছের একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি থেকে জানাজা ও দাফনের অনুমতিও নিয়েছিলেন।
কিন্তু দাফনের আধা ঘণ্টা না পেরোতেই তিনি ও তাঁর ভাইয়েরা আবার কবরস্থানের সামনে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, কয়েকজন সশস্ত্র অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী ভারী যন্ত্র দিয়ে নতুন কবরটি খুঁড়ছে।
প্রথমে বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন মোহাম্মদ। কিন্তু তারা যখন কবরের ভেতরের পাথরের স্ল্যাব ভেঙে ফেলতে যাচ্ছিল, তখন তিনি দ্রুত কবরের কাছে যান।
মোহাম্মদ বলেন, ‘তারা প্রায় মরদেহ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আমি নিশ্চিত, তারা মরদেহ সরিয়ে ফেলতে যাচ্ছিল। তাই তখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।’
বসতি স্থাপনকারীরা কাছের সা-নুর নামের একটি পুনঃস্থাপিত অবৈধ বসতি থেকে এসেছিল। কবরস্থানের ওপরে পাহাড়ে ওই অবৈধ বসতির অবস্থান।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সব ইসরায়েলি বসতি অবৈধ। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার সম্প্রতি সা-নুর বসতিটি আবার চালুর অনুমতি দিয়েছে। পশ্চিম তীরে নতুন বসতি সম্প্রসারণের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে এটি করা হয়।
মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, সশস্ত্র অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা আসাসা পরিবারকে হুমকি দিয়ে বলছে, ‘তোমরা কবর খুঁড়ে মরদেহটি তোলো, না হয় আমরা তুলব।’ তাদের দাবি ছিল, কবরটি তাদের বসতির খুব কাছে।
আরও কিছু ছবিতে দেখা যায়, পরে মোহাম্মদ ও তাঁর ভাইয়েরা বাবার কাফনে মোড়ানো মরদেহ কবরস্থান থেকে তুলে পাহাড় বেয়ে নিচে নিয়ে যাচ্ছেন। অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা তখন দূর থেকে তা দেখছিল।
পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করেছে এবং বসতি স্থাপনকারীদের কাছ থেকে খোঁড়াখুঁড়ির যন্ত্র জব্দ করেছে, যাতে উত্তেজনা বৃদ্ধি না পায়।
তবে পরিবারটির অভিযোগ, সেনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখেছে। অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের চাপে তাঁদের অপমানজনকভাবে নতুন কবরটি থেকে মরদেহ তুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, শৃঙ্খলা, আইনের শাসন এবং জীবিত ও মৃত মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে—এমন যেকোনো আচরণের নিন্দা জানায় তারা।
‘কেউই রেহাই পাচ্ছে না’
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এই ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ এবং অধিকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অমানবিক আচরণের প্রতীক’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের স্থানীয় প্রধান অজিত সাংঘাই বলেন, ‘জীবিত হোক বা মৃত—কেউই এই নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অবৈধ সা-নুর বসতি পুনঃস্থাপনের পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে।
হুসেইন আসাসার শোক পালনের জন্য টানানো তাঁবুতে আসা এক অতিথি বলেন, ‘আবার ফিরে আসার পর তারা মনে করছে, পুরো এলাকাই এখন তাদের। এটা খুবই ভয়ংকর।’
আসাসা পরিবারের আরেক সদস্য বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের এক আত্মীয়ের জমিতে সেনা ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা ঢুকে কোনো কারণ ছাড়াই সব জলপাইগাছ কেটে ফেলেছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, সা-নুরে বসতি স্থাপনকারীদের ফিরিয়ে আনার পর পুরো এলাকার বড় একটি অংশকে ‘বদ্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে।
মূলত এর অর্থ হলো, গ্রামের মানুষ এখন নিজেদের জলপাইবাগান, ফসলি জমি, এমনকি কবরস্থানেও ইচ্ছেমতো প্রবেশ করতে পারবে না।
গ্রামবাসীরা বলছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে অনুমতি নেওয়ার পরও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা বেশি আগ্রাসী আচরণ করছে। তাঁদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। বিশ্বের দৃষ্টি যখন অন্য যুদ্ধ ও সংঘাতের দিকে। ফলে এসব ঘটনা আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। আরও অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নেতানিয়াহু সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের সমর্থন পেয়ে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা এখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অস্ত্র ব্যবহারেও তারা আগের চেয়ে বেশি আগ্রাসী। ফলে অধিকৃত ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও জীবিকা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত হুসেইন আসাসার মরদেহ পাশের গ্রামের একটি ছোট কবরস্থানে আবার দাফন করেন তাঁর ছেলেরা। সেখানে অন্তত তাঁকে আর সেই অপমান ও উত্তেজনার মুখে পড়তে হয়নি, যা এখন এই ভূখণ্ডের অনেক মানুষের নিত্যদিনের ভাগ্যে পরিণত হয়েছে।