সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা পর কালো ধোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা পর কালো ধোঁয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলা, ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে প্রতিবেশী যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। তেহরানের এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে জ্বালানি স্থাপনাও। গতকাল সোমবার এ ধরনের কয়েকটি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে গ্যাস ও তেল শোধনাগার বন্ধ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ইসরায়েলের মতো উন্নত না হওয়ায় ইরান তাদের সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাঁরা বলছেন, এই অঞ্চলের প্রধান তেল শোধানাগারগুলোতে ইরানের হামলা যুদ্ধের কারণে সংকটে থাকা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমস্যা যোগ করেছে। তা মূলত এই অঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিকে আঘাত করছে।

গতকাল একটি ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগার বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি আরামকোর রাস তানুরা রিফাইনারি নামের ওই শোধনাগারের উৎপাদনক্ষমতা প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল।

কাতারও গতকাল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করেছে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জির একটি স্থাপনায় ইরানের ছোড়া দুটি ড্রোন আঘাত হানার পর এই পদক্ষেপ নেয় দেশটি। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। উপসাগরীয় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে এলএনজি চাহিদায় ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে কাতারের। তাদের গ্রাহকদের ৮২ শতাংশই এশিয়ার।

রাস তানুরা তেল শোধনাগার ও তেল টার্মিনালে আরামকোর একটি ট্যাংক দেখা যাচ্ছে

গতকাল সকালে কুয়েতের আহমাদি তেল শোধনাগারে ভূপাতিত করা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুজন কর্মী আহত হয়েছেন। গতকাল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তৃতীয় দিনের মতো পাল্টাপাল্টি হামলায় ইরাকের কুর্দিস্তানের বেশির ভাগ তেলক্ষেত্র এবং ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল কাতারের রাজধানী দোহা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

এদিকে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়। পরে বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি এই প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে ইতিমধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এক দিনের ব্যবধানে তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮২ ডলারে উঠেছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের পর থেকে সর্বোচ্চ।

এ পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেল শোধনাগার ও গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ হয়ে পড়াকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নরওয়েভিত্তিক জ্বালানি গবেষণা ও বাণিজ্যবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োর্গে লেওন ফ্রান্স টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘এটা সত্যিই একটি উদ্বেগের বিষয়। এর আগে পর্যন্ত আমরা জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা করতে দেখিনি। এ অবস্থা যত দিন চলতে থাকবে, তাতে আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আমরা তেল ও গ্যাসের দাম তত বেশি বাড়তে দেখব।’

সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পর লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

ইরান কেন জ্বালানি অবকাঠামোকে নিশানা করছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত গতকাল আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহ গতকাল ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর লেবাননে ওই গোষ্ঠীর অবস্থান লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।

ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁরা কোনো সমঝোতা করবেন না।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরানের হামলার কারণ সম্পর্কে বাহরাইনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক সাচা ব্রুচমান এপিকে বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করার জন্যই ইরান জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে আঘাত হানছে।

কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েত, ২ মার্চ

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক টরবজর্ন সলটভেডট বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো এখন সরাসরি ইরানের নজরে রয়েছে। তিনি বলেন, ইরান তেলবাহী ট্যাংকার, আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্য পথ ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইছে। সে কারণে সামনে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন রিস্টাড এনার্জির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োর্গে লেওন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে দিনে এক কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তা হবে বিশ্বে দিনে মোট ব্যবহৃত তেলের ১০ শতাংশ। এটাই বর্তমান সংকটের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি তুলে ধরছে।

স্বল্প মেয়াদে দেশগুলো তাদের মজুত থাকা তেল দিয়ে চাহিদা পূরণ করতে পারবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ইঙ্গিত দিয়েছেন—তিন বা চার সপ্তাহ যুদ্ধ চলার, তেমনটি হলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতি তার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্টার্ন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক আরাং কেশাভারজিয়ান।

আবুধাবিতে জায়েদ বন্দরে হামলার পর ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। ১ মার্চ, ২০২৬

তা ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দুবাই, দোহা, আবুধাবি ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে খাদ্য ও নিত্যপণ্য সরবরাহে টান পড়বে।

আরাং কেশাভারজিয়ান, ‘এসব দেশ ব্যাপকভাবে ফলমূল, সবজিসহ অন্যান্য মৌলিক পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সেগুলো সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়েই জাহাজে করে নেওয়া হয়।’

লন্ডনের কিংস কলেজের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রভাষক রব গেইস্ট পিনফোল্ড আল–জাজিরাকে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে কী করছে তা ইরান ‘ঠিক জানে’। তিনি বলেন, ‘তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে বেছে নিয়েছে, কারণ এগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তু। এসব দেশ যুদ্ধের জন্য ততটা আগ্রহী নয়। কারণ, দিন শেষে এটা তাদের যুদ্ধ নয়।’

ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও কিছুটা হতাশা রয়েছে। সৌদি আরবের একজন কর্মকর্তা আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে ত্যাগ করে তার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য মোতায়েন করেছে। তারা সব উপসাগরীয় দেশকে, যেখানে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলো রয়েছে, ইরানের হামলার মুখে ছেড়ে দিয়েছে।’