
সৌদি আরবে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা, যার মধ্যে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশিও রয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৫৯ বিদেশি নাগরিকের এ সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর করা হয়েছে। বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদান, বিদেশি আসামিদের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নির্যাতনের অভিযোগ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এ প্রেক্ষাপটে দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে তৈরি ধারাবাহিকের আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব।
গত বছরের মে মাসের কোনো একদিন। সৌদি আরবে এক ইথিওপীয় বন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এর আগে দেশে থাকা মাকে ফোন করে তিনি বলেছিলেন, পরদিন সকালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হবে। সেদিনই হবে তাঁর শেষ নিশ্বাস। কথাটা শুনেই শুরু হয় মায়ের ‘গগনবিদারী কান্না’।
ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। ওই ইথিওপীয়র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়; কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ গেলেও লাশ পরিবারের হাতে আসেনি। এদিকে ছেলেকে শেষবারের মতো দেখার অপেক্ষা করে করে মায়ের মধ্যে তীব্র মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়; শেষে তাঁকে ভর্তি করতে হয় হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগে।
ঘটনাটি লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে জানিয়েছিলেন ইথিওপীয় সম্প্রদায়ের একজন সদস্য। তাঁর নিজের ভাইও সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ওরা (সৌদির শাসকেরা) শুধু আমাদের ভাইদের মারছে না, আমাদেরও মারছে।’
উল্লেখ্য, সৌদি আরবের খামিস মুশাইত কারাগারেই এখন মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে বন্দী আছেন ৫৮ ইথিওপীয়।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের হিসাব খুললে বিদেশিদের সংখ্যা পড়বে চোখে পড়ার মতো। দেশটির মোট ৩ কোটি ৫৩ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৫৭ লাখের মতো মানুষ বিদেশি। অথচ ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শুধু মাদক অপরাধেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ৫৯৭ জনের; তাঁদের প্রায় ৭৫ শতাংশই প্রবাসী।
হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া ইথিওপীয় বন্দীর ঘটনাটি কোনো ব্যতিক্রম নয়। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের হিসাব খুললে বিদেশিদের সংখ্যা পড়বে চোখে পড়ার মতো। দেশটির মোট ৩ কোটি ৫৩ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৫৭ লাখের মতো মানুষ বিদেশি/প্রবাসী। অথচ ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শুধু মাদক অপরাধেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ৫৯৭ জনের; তাঁদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বিদেশি (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য)।
বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইএসওএইচআরের তথ্য, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি–জুন) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ৫৯ জন (প্রায় ৫৪ শতাংশ) বিদেশি। একই সময়ে মাদক অপরাধে কার্যকর করা ৭১টি মৃত্যুদণ্ডের ৪৯টি বিদেশির।
কোন দেশের কতজন
এই হিসাবে চোখ রাখলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত দশকে শুধু মাদক অপরাধে ১৫০ জন সৌদি নাগরিকের পাশাপাশি যাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ১৫৫ জন পাকিস্তানি, ৬৬ জন সিরীয়, ৫০ জন জর্ডানি, ৩৯ জন ইয়েমেনি, ৩৩ জন মিসরীয়, ৩২ জন নাইজেরীয়, ২২ জন সোমালীয় ও ১৩ জন ইথিওপীয়।
এ ছাড়া ইরান, আফগানিস্তান, চাদ, বাহরাইন, লেবানন, সুদান, তুরস্ক, ভারত ও ফিলিস্তিনের নাগরিকদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে পাকিস্তানি নাগরিকের সংখ্যা সৌদি নাগরিকের সংখ্যাও ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এ হিসাবের একটি সীমা আছে, যা অ্যামনেস্টি স্বীকার করেছে। তাদের বিশ্লেষণ শুধু সৌদি কর্তৃপক্ষ সরকারি সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে যেসব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা প্রকাশ করেছে, সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার ও সাজার প্রতিটি ধাপে বৈষম্য ঘটছে কি না, সে তথ্য এতে ধরা পড়ে না। অপরাধের ঘটনা, গ্রেপ্তার, অভিযোগ বা সাজার সরকারি পরিসংখ্যানও সংস্থাটির হাতে নেই। সে কারণে অ্যামনেস্টি বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছে।
বিচারের আগেই শুরু হয় ঝুঁকি
এই প্রবাসীদের বিপন্নতা শুরু হয় বিচারের অনেক আগে, দেশ ছাড়ার সময় থেকেই। সৌদি আরবের মোট কর্মী বাহিনীর প্রায় ৭৭ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক। অ্যামনেস্টির বিশ্লেষণে, তাঁদের অসুবিধা শুরু হয় নিজ দেশে, প্রতারণামূলক নিয়োগপদ্ধতিতে; সৌদি আরবে এসে তা ধরে রাখে কাফালা বা স্পনসরশিপ ব্যবস্থা।
কাফালা এমন এক সীমাবদ্ধ ও শোষণমূলক অভিবাসন ব্যবস্থা, যা আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর বিশেষভাবে নেতিবাচক প্রভাব বা চাপ ফেলে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) নির্দেশিকা অনুযায়ী, হুমকি, বলপ্রয়োগ, জবরদস্তি বা প্রতারণার মাধ্যমে কাউকে শোষণের উদ্দেশ্যে নিয়োগ, পরিবহন বা আশ্রয় দেওয়া মানব পাচারের সংজ্ঞায় পড়ে। এই শোষণের মধ্যে যেমন জোরপূর্বক শ্রম আছে, তেমনি আছে অবৈধ কাজে বাধ্য করাও।
আইওএম সৌদিপ্রবাসীদের ঝুঁকির কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে অনিয়মিত অভিবাসন; গৃহকর্ম, সমুদ্রে কাজ বা অনানুষ্ঠানিক খাতের মতো চোখের আড়ালের কাজ; নিয়োগকর্তার অনুচিত নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগে দুর্নীতি, তৃতীয় পক্ষের দালালের ওপর নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় ফাঁক অন্যতম।
সৌদি গিয়ে কোনো আইনি জটিলতা বা অপরাধে জড়িয়ে পড়লে, নিজেদের সহায়-সম্বল ও শিক্ষার অভাবে প্রবাসীরা ভালো কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না বা সঠিকভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগও কমে যায়। এতে ন্যায্য বিচারের অধিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ঝুঁকি শুধু তত্ত্বের কথা নয়। অ্যামনেস্টির নথিবদ্ধ মামলাগুলোর দুটিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বলেছেন, তাঁদের জোর করে নিষিদ্ধ মাদক বহন করানো হয়েছিল; কিন্তু আদালত সেই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেননি, মেনেও নেননি। সংস্থাটির নথিবদ্ধ তথ্য বলছে, সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিকেরা নিয়োগ-দালালদের হাতে প্রতারিত হয়েছেন, অতিরিক্ত ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং মজুরি চুরির শিকার হয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে তা সম্ভবত শ্রম শোষণের উদ্দেশ্যে মানব পাচারের শামিল।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের প্রভাব বিদেশি নাগরিকদের ওপর অসমভাবে পড়ে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর এ অসম প্রভাব বন্ধের আহ্বান তাঁরা জানিয়েছেন। কারণ, বিচার ও আপিলের সময় কার্যকর আইনি সুরক্ষা জোগাড় করা এসব মানুষের পক্ষে প্রায়ই সম্ভব হয় না।
আবার যখন কেউ একই সঙ্গে একাধিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তখন ওই সব সমস্যার একটি অন্যটিকে আরও তীব্র বা জোরালো করে তোলে। যেমন একজন শুধু অভিবাসী হওয়ার কারণেই বিভিন্ন অসুবিধায় পড়তে পারেন। কিন্তু তিনি যদি একই সঙ্গে কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতিসত্তার হন এবং নারী (লিঙ্গ) হন, তাহলে তাঁর জন্য আইনি সহায়তা পাওয়া, কাজের জায়গায় অধিকার আদায় করা বা বৈষম্য এড়ানো দ্বিগুণ বা তিন গুণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এখানে একটি অসুবিধা অন্য অসুবিধাটিকে হালকা না করে বরং বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আদালতে একা, ভাষা না জানা
এ বিপন্নতা আদালতে কেমন চেহারা নেয়, তা বুঝতে ইএসওএইচআর ও জেপিপির (জাস্টিস প্রজেক্ট পাকিস্তান) সহায়তায় মিসর, ইথিওপিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান ও সোমালিয়ার ২৫ বিদেশির মামলা নথিবদ্ধ করেছে অ্যামনেস্টি। তাঁরা সবাই মাদক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত; কেউ এখন মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায়, কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে।
গ্রেপ্তার হওয়া থেকে রায় পর্যন্ত এবং কারও ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পরও সৌদি বিচারব্যবস্থার ভেতর দিয়ে সংশ্লিষ্ট বন্দী ও তাঁদের পরিবারগুলো কীভাবে পথ চলেছে, সেটা খতিয়ে দেখেছে অ্যামনেস্টি। সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে ১৩ জনের পরিবার, ৪ জনের নিজ সম্প্রদায়ভুক্ত সদস্য ও ১ জন কনস্যুলার কর্মকর্তার। আরও ১৫ জনের আদালতের নথিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
পর্যালোচনার ফলাফল হলো, কম পড়াশোনা, ভাষাজ্ঞান আর টাকার অভাব থাকার কারণে এসব মানুষের দ্বিগুণ ক্ষতি হচ্ছে। প্রথমত, অভিবাসনের সময় ক্ষতি। টাকাপয়সা কম থাকায় এবং নিজের অধিকার বা নিয়মকানুন ভালোভাবে না বোঝায় সৌদি আরবে যাওয়ার শুরুতেই তাঁরা দালালদের প্রতারণা বা শোষণের শিকার হচ্ছেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবর অনেক পরিবার পেয়েছে অন্য বন্দীদের ফোনকলে কিংবা গণমাধ্যমে, যখন সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় তা প্রকাশ করেছে।
দ্বিতীয়ত, সৌদিতে গিয়ে কোনো আইনি জটিলতা বা অপরাধে জড়িয়ে পড়লে, নিজেদের সহায়-সম্বল ও শিক্ষার অভাবে প্রবাসীরা ভালো কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না বা সঠিকভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগও কমে যায়। এতে ন্যায্য বিচারের অধিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ওই ২৫ জনের অনেকে একা বিচারব্যবস্থার ভেতর দিয়ে গেছেন; আদালতের নথি বা নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁরা বুঝতে পারেননি, সেগুলো হাতেও পাননি। কনস্যুলার সহায়তা পাননি। সৌদি ফৌজদারি ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে পরিচয়হীনতা, গ্রেপ্তারের সময় নিজের অধিকার সম্পর্কে সীমিত ধারণা, পর্যাপ্ত দোভাষী ও আইনজীবী ছাড়া আদায় করা স্বীকারোক্তির ঝুঁকি এবং সহায়তার অভাব—সব মিলিয়ে জটিল আইনি প্রক্রিয়া সামলে কার্যকর আত্মপক্ষ সমর্থন তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন, কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাগজে অধিকার আছে। সৌদি আরবের ২০১৩ সালের ‘ফৌজদারি কার্যবিধি’ তদন্ত ও বিচার—দুই ধাপেই আসামিদের আইনি সহায়তার অধিকার দেয়, নির্যাতনও নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ইএসওএইচআর খামিস মুশাইত, নাজরান ও তাবুক কারাগারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের মামলায় যে চিত্র নথিবদ্ধ করেছে, তা ভিন্ন। তাঁদের পেশাদার দোভাষী নেই, আইনি সহায়তা নেই, বিচারপ্রক্রিয়া তাঁরা বোঝেননি, আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ পাননি। অনেক ক্ষেত্রে বন্দীরা নিজেরাই জানতেন না, তাঁদের দণ্ড কবে বহাল হলো কিংবা ক্ষমার আবেদন কবে নাকচ হলো।
একসঙ্গে সরানো হয়, তারপর একে একে...
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা তিন মিসরীয়র আসন্ন মৃত্যুদণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানান। ৩ ডিসেম্বর এ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তাবুক কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা অন্তত ৪০ মিসরীয়র একটি বড় দলের অংশ ছিলেন তাঁরা।
ওই বছরের নভেম্বরে আরব, আফ্রিকা ও এশিয়ার (দক্ষিণ এশিয়াসহ) বিভিন্ন দেশের কয়েকজন বন্দীর সঙ্গে উল্লিখিত তিন মিসরীয়কে সরিয়ে নেওয়া হয় একটি আলাদা ওয়ার্ডে, যেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য সহবন্দীদের একে একে নিয়ে যেতে দেখেছেন তাঁরা। আর অন্য বন্দীরা নিজেদের পালার আতঙ্কে কাটিয়েছেন। অ্যামনেস্টির হিসাবে ২০২৪ সাল থেকে ওই মিসরীয়দের ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে; ১৯ জন এখনো দণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন (তথ্য অ্যামনেস্টির)।
নভেম্বর মাসেই জাতিসংঘের দুজন বিশেষ দূত সৌদি আরবের সরকারকে যৌথভাবে চিঠি পাঠিয়ে তিন মিসরীয়র পাশাপাশি আরও ২৯ বিদেশি পুরুষের মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তোলেন। এঁদের ২৮ জন ছিলেন মিসরীয়, একজন জর্ডানি। ইএসওএইচআরের সাম্প্রতিক তথ্য হলো, তাবুক কারাগারে এখন আটজন মিসরীয় মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে বন্দী আছেন।
একই ধরনের অপরাধে দণ্ডিত বিদেশি বন্দীদের একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন ওয়ার্ডে সরিয়ে নেওয়ার রীতি—যেমন তাবুকে মিসরীয়, নাজরানে ইথিওপীয় ও সোমালীয়দের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এটাকে বন্দীরা ও তাঁদের পরিবারগুলো আসন্ন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে দেখে। ইএসওএইচআরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বন্দীরাও বলেছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্কে আছেন। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ আসন্ন মৃত্যুদণ্ডের আগাম খবর না দেওয়ার চর্চাকে বারবার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি দুর্ব্যবহারের একটি রূপ, যা নির্যাতন ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে।
আমরা ভেঙে পড়েছিলাম, বিশেষ করে এ জন্য যে শোক করার মতো সামনে ভাইয়ের মরদেহ নেই। কোনো শেষবিদায়ের আয়োজনও নেই।
‘তোমার পালা এসেছে’: অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের আমৃত্যু প্রহর
বন্দীদের পরিবারগুলো অনেক সময় জানতেই পারে না, কবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। অ্যামনেস্টি বলছে, সৌদি আইনে বন্দী বা তাঁর পরিবারকে আগাম নোটিশ দেওয়ার স্পষ্ট বিধান নেই। বড়জোর মৃত্যুদণ্ডের ২৪ ঘণ্টা আগে বন্দী নিজে ফোন করে খবর দিতে পারেন বলে জানিয়েছে বন্দীদের পরিবারগুলো। কারও ক্ষেত্রে কারা কর্মকর্তারা আগের দিন জানিয়ে দিয়েছেন, ‘তোমার পালা এসেছে।’ বহু বন্দী পরিবারকে সহবন্দীদের কীভাবে মাঝরাতে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়া সেল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা বলেছেন।
আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবর অনেক পরিবার পেয়েছে অন্য বন্দীদের ফোনে কিংবা গণমাধ্যমে, যখন সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় তা প্রকাশ করেছে। পাকিস্তানি এক বন্দীর ক্ষেত্রে পরিবার কয়েক দিন পর খবর জেনেছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অপেক্ষায় থাকা অন্যদের ফোনকলে। কারও কারও ক্ষেত্রে কারা কর্মকর্তারাই তাঁদের দিয়ে খবরটা পৌঁছে দিতে বলেছেন। দূরত্ব আর ফোনে বিরল যোগাযোগের কারণে এমন পরিবারগুলোকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা নিয়ে কাটাতে হয়।
যাঁদের প্রিয়জন (বন্দী) বছরের পর বছর মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের (বন্দী) জন্য মামলার অগ্রগতির তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব, অনিয়মিত যোগাযোগ আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার নিরন্তর ভয় মিলে তৈরি হয় ‘আমৃত্যু উদ্বেগ ও হতাশার’ অবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক চাপ—গ্রেপ্তারের পর পরিবার হারিয়েছে তার প্রধান উপার্জনকারীকে। আর দূর থেকে প্রিয়জনের শারীরিক ও মানসিক অবনতি দেখার কষ্ট তো আছেই।
ফেরে না লাশ
কিছু পরিবারের জন্য যন্ত্রণা আরও বাড়িয়েছে মরদেহ আটকে রাখা। সৌদি আইনে মরদেহ হস্তান্তরেরও নিশ্চয়তা নেই।
অ্যামনেস্টির নথিবদ্ধ ২৫ জনের তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে। তিনটি ক্ষেত্রেই সৌদি আরব মরদেহ পরিবারকে ফেরত দেয়নি, কবর কোথায় তা–ও জানায়নি। এতে পরিবারগুলো নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী শোক পালনের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে, বলেছে সংস্থাটি।
বন্দী জর্ডানের নাগরিক হুসেইন আবু আল-খায়েরের পরিবারের কাছে এই কষ্টের চেহারা আরও জটিল। মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার সময় তিনি তাঁর মামলার অবস্থা নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর পেয়েছিলেন। ২০২৩ সালের মার্চে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। খবরটি শুনে রাজধানী আম্মানে তাঁর পরিবার প্রথমে নীরবে বসে ছিল, তারপর ‘পাগলের মতো চিৎকার’ শুরু করে—বলেছেন তাঁর বোন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা ভেঙে পড়েছিলাম, বিশেষ করে এ জন্য যে শোক করার মতো সামনে ভাইয়ের মরদেহটি নেই। কোনো শেষবিদায়ের আয়োজনও নেই।’
বাংলাদেশি পরিবারগুলোর উদ্বেগ
সৌদি আরবে প্রবাসীদের বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ডের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ও উদ্বেগ বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ওপরও গভীরভাবে এসে পড়ে।
সৌদিতে বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশের, অন্তত ২৫ লাখ। এরপর ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন ও মিসরের। ইএসওএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকও আছেন। সম্প্রতি পবিত্র মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে; তাঁরা ওই ছয় মাসের হিসাবের বাইরে। ওই সময়ে কতজন বাংলাদেশির সাজা কার্যকর হয়েছে, তা জানা যায়নি।
আগেই বলা হয়েছে, সৌদি আরবের আদালত ও বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রবাসীরা ঠিক কী ধরনের বৈষম্য ও আইনি সংকটের মুখোমুখি হন, সেটি বিস্তারিত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করার জন্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২৫টি মামলা বেছে নথিভুক্ত করেছে। মামলাগুলো মিসর, ইথিওপিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান ও সোমালিয়ার বন্দীদের নিয়ে। মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া যেসব দেশের নাগরিকের নাম সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, তার মধ্যেও বাংলাদেশ নেই। এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশিরা এই হিসাবের বাইরে। কারণ, ইএসওএইচআরের তালিকায় তাঁদের নাম আছে। বরং সমস্যা তথ্যের অভাব।
ইএসওএইচআর জানিয়েছে, ১০৮টির মধ্যে ৯১টি (৮৪ দশমিক ২ শতাংশ) মামলা সম্পর্কে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা কোনো তথ্য জানতে বা নথিবদ্ধ করতে পারেনি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হাতেও গ্রেপ্তার, অভিযোগ বা সাজার সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে বাংলাদেশি বন্দীর সংখ্যা, অভিযোগের ধরন, আইনজীবী ও দোভাষীর সুযোগ কিংবা কনস্যুলার সহায়তা নিয়ে কোনো উত্তর নেই।
পরিশেষ
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য চিহ্নিত করেছে। কমিটির উদ্বেগ, শিয়া সংখ্যালঘু, অভিবাসী শ্রমিক ও গৃহকর্মীরা (নারীসহ) সেখানে যথেচ্ছ আটক, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন।
এই কমিটি মৃত্যুদণ্ডে স্থগিতাদেশ আরোপ করে বিলোপের পথে এগোতে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। দেশটিতে বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য বা পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ ও স্পষ্ট তদন্ত দাবি করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও।
ভাষা না বোঝা, আইনজীবী না পাওয়া, শেষ খবরটুকুও দেরিতে আসা, আর লাশ না ফেরা—ধাপগুলো আসলে একই শিকলে বাঁধা। অ্যামনেস্টির ভাষায়, সৌদি আরবে গ্রেপ্তার বা আটক হওয়া প্রবাসীরা একই সঙ্গে একাধিক জটিল এবং পরস্পর সম্পর্কিত সমস্যার মুখোমুখি হন। তাঁরা অপরিচিত বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হন, সেখানকার ভাষা ও সংস্কৃতি বোঝেন না, এসবের পাশাপাশি তাঁদের কোনো আইনি বা দোভাষীর সাহায্য দেওয়ার মানুষও থাকে না। এই সব কটি বাধা একত্রে মিলে তাঁদের নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করা বা জীবন বাঁচানোর লড়াইকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
অন্যদিকে এই শিকলের শেষ প্রান্তে বসে আছেন সেই ইথিওপীয় মা (প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা), যিনি ছেলের মুখে ‘শেষ নিশ্বাস’-এর কথা শুনেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পরও লাশ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগে ভর্তি হতে হয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১. ডব্লিউআইপিওর নিবন্ধ—Law of Criminal Procedure (promulgated by Royal Decree No. M/39 of 28 Rajab 1422 (16 October 2001)), Saudi Arabia;
২. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন—Saudi Arabia: ‘If We Had Money and a Lawyer, Maybe My Brother Would Be Alive’: Saudi Arabia’s Execution Crisis, 7 July 2025
৩. এমইএনএ (মিনা) রাইটস গ্রুপ, এএলকিউএসটি ফর হিউম্যান রাইটস এবং ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)—তিনটি মানবাধিকার সংস্থার যৌথভাবে তৈরি করা প্রতিবেদন—Death penalty in Saudi Arabia: joint submission to the Special Rapporteur on extrajudicial, summary or arbitrary executions, March 10, 2026; এবং
৪. ইএসওএইচআরের প্রতিবেদন—108 Saudi Arabia: Executions in the First Half of 2026.