অবৈধ বসতিগুলো শুরুতে সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়।
১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীরে এই পদ্ধতিতে বসতি স্থাপন শুরু হয়। পরে অন্য এলাকাতেও ছড়ায়।
ফিলিস্তিনের গাজায় তিনটি অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীরে নির্মাণকাজ সম্প্রসারণে ৪০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও অর্থমন্ত্রী ইসরায়ের কাৎজ। একই সময়ে ওই অঞ্চলের ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডার অবৈধ বসতিগুলোকে তাঁদের নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে প্রশংসা করেছেন।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর আগেই অধিকৃত ফিলিস্তিনের ভূমিতে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করতে এবং ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে উগ্রপন্থী যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর সরকার।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, তিনি উত্তর গাজায় তিনটি অবৈধ বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। এটি একধরনের সামরিক বসতি, যা কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি বেসামরিক বসতি স্থাপনের পথ সুগম করে আসছে।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ১২টির বেশি নতুন ইসরায়েলি বসতির জন্য ১৩০ কোটি শেকেল অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বিরোধিতার কারণে গত মাসে মন্ত্রিসভায় এই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, তিনি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের কাজের প্রশংসা এবং তাঁদের সামরিক বাহিনীর নিরাপত্তা অংশীদার বলে মনে করছেন। পশ্চিম তীরের একটি বসতিতে বেড়ে ওঠা ব্লুথ গত বুধবার ‘ফার্মস অ্যাসোসিয়েশন’ নামের একটি সংগঠনের সভায় এ কথা বলেন। এই সংগঠন এমন সব বসতির প্রতিনিধিত্ব করে, যা স্বয়ং ইসরায়েলি আইনেই অবৈধ।
অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমি থেকে বিতাড়িত করার পেছনে এসব বসতি মূল ভূমিকা পালন করে আসছে। পশ্চিম তীরে ইহুদিদের সহিংসতার পেছনে সরকারের সমর্থনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী এবং সব নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধানসহ ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাত শ্রেণির অনেকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
ফিলিস্তিনের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এই সপ্তাহে প্রকাশিত একটি নতুন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা আসলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গ্রাসের উদ্দেশ্যে এই বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহার করছে এবং অপরাধীদের বিচার না হওয়ায় এই সহিংসতা লাগামহীনভাবে বাড়ছে।
ইসরায়েলের অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘পিস নাউ’-এর হাগিত ওফরান বলেন, ভোটের দিনের আগেই অন্তত সাতটি বসতিতে লোকজন বসবাসের উপযোগী করতে বুলডোজার দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। ওফরান বলেন, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে নির্বাচনের আগে জনগণের অর্থ লুটপাটের এক বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় নেমেছে নেতানিয়াহু সরকার।
ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত গাজার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের সময় কাৎজ গাজায় বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি গাজায় জাতিগত নিধনের পক্ষেও জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ভূমি দখল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কেরেম নাভোটোর প্রতিষ্ঠাতা ড্রোর এটকেস বলেন, অবৈধ বসতিগুলো দীর্ঘ মেয়াদে সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয় না। তিনি বলেন, সামরিক বাহিনী হলো কেবল প্রথম ধাপ, যার উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করা। পশ্চিম তীরে ডজনখানেক ইসরায়েলি বসতি এভাবেই গড়ে উঠেছে।
এটকেস জানান, ১৯৫০-এর দশকে গাজা উপত্যকাসহ বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলে প্রথম নাহাল বসতি স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও একই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হয়, যা প্রথমে জর্ডান উপত্যকা এবং পরে অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্মোট্রিচ গত মাসে আরও বলেছিলেন, গাজায় তিনটি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত এবং নেতানিয়াহু সবুজসংকেত দিলেই কাজ শুরু হতে পারে। তবে কাৎজের এই পরিকল্পনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল তামির ইয়াদাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী
কাৎজকে জানান, ইসরায়েল এখন গাজার ৬৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায়
হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির ৫৩ শতাংশের সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে টিকে থাকা প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি এখন গাজার অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় ঠাসাঠাসি করে বাস করছেন। ইয়াদাই বলেন, এখানে ৭০ হাজারের বেশি গাজাবাসীকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ হাজার শিশু রয়েছে।