গতকাল শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়
গতকাল শনিবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়

২১ ঘণ্টার আলোচনা ভেস্তে গেল, পরস্পরকে দোষারোপ যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ থামাতে ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দীর্ঘ বৈঠক শেষে আজ রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেন, তেহরানকে ‘চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব’ দেওয়ার পর তিনি আলোচনার টেবিল ছেড়ে যাচ্ছেন। এদিকে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিকে দায়ী করা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালালে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এ ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গতকাল শনিবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এটি ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। ভ্যান্স বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে একটি ‘মৌলিক প্রতিশ্রুতি’ চাইছে ওয়াশিংটন। তবে এ আলোচনায় তেমন কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানকে প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দিচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ভ্যান্স। এর আগে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আলোচনার সুযোগ দিতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত রাখবে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গতকাল শুরু হওয়া এই আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই কঠোর অবস্থান নেয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণকারী জাহাজ পাঠানো হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানি গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ‘অতিরিক্ত দাবি’ করছে বলে অভিযোগ করার পরপরই বোঝা গিয়েছিল যে আলোচনায় টানাপোড়েন চলছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে আনা-নেওয়া করা হয়।

পাকিস্তানের রাজধানীতে টানা ২১ ঘণ্টার বৈঠক শেষে আজ জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে একটি খুবই সহজ প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি, এটি আমাদের চূড়ান্ত ও সর্বোত্তম প্রস্তাব। এখন দেখা যাক, ইরান তা গ্রহণ করে কি না।’

ভ্যান্স ইতিমধ্যে পাকিস্তান ছেড়েছেন।

এদিকে আজ ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণে ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরআইবি বলেছে, ‘ইরানি প্রতিনিধিদল ইরানি জনগণের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য টানা ২১ ঘণ্টা নিবিড়ভাবে আলোচনা চালিয়ে গেছে। ইরানি পক্ষের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক দাবিগুলো আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এভাবে আলোচনা থেমে গেছে।’

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন ব্যবসায়ী ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের বৈঠক হয়েছিল। ওই আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। হামলার শুরুতেই ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।

হামলার পর দ্রুতই ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব খাটায়। এতে বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়ে যায়। জ্বালানির বাড়তি দামে মার্কিন জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

গতকাল আলোচনা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর আলাদাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, আলোচনার ফলাফল নিয়ে তিনি তেমন উদ্বিগ্ন নন। তাঁর দাবি, ইরানের নেতাদের হত্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় অর্জন করেছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘চুক্তি হোক বা না হোক, এতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ, আমরা ইতিমধ্যেই জিতে গেছি।’

পাকিস্তানে আয়োজিত আলোচনায় ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলে কুশনার ও উইটকফও ছিলেন। অন্যদিকে ৭০ সদস্যের ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। দলটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও ছিলেন।