
আয়তনের দিক দিয়ে বেশ ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্র। একসময় টিকে থাকার লড়াইয়ে থাকা দেশটি আজ বিপুল সম্পদ ও আঞ্চলিক–আন্তর্জাতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে অনেক শক্তিশালী করেছে। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই থেকে কাতারকে প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার এই সাফল্যের নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন দেশটির সদ্য প্রয়াত আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। যিনি বর্তমান আমি শেখ তামিম বিন হামাদ আল–থানির বাবা। তাঁকে কাতারে বাবা আমিরও বলা হয়ে থাকে।
গতকাল রোববার কাতারের আমিরের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে শেখ হামাদের মৃত্যুর খবর জানানো হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
কাতারের রাজধানী দোহার ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহাব মসজিদে মাগরিবের নামাজের পর কোনো আড়ম্বর ছাড়াই তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শোকাহত লোকজন কাতারের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে জানাজায় অংশ নেন।
এরপর প্রয়াত শেখ হামাদের ছেলে এবং বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল–থানিসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা মসজিদ থেকে মরদেহ বের করে নিয়ে যান। শেখ হামাদকে দোহার উত্তরে অবস্থিত লুসাইল কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
দূরদর্শী শেখ হামাদ
শেখ হামাদ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রান্তিক অবস্থান থেকে কাতারকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, জাতীয় ও মানবিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেন। এর পেছনে ছিল তাঁর এমন এক দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি, যা দেশের সীমিত আকার ও ছোট ভৌগোলিক সীমানাকে ছাড়িয়ে বৃহত্তর সম্ভাবনাকে দেখতে পেরেছিল।
শেখ হামাদের শাসনামলেই কাতার আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এই আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটিতে। একই সঙ্গে কাতার রাজধানী দোহায় হামাস নেতৃত্বকেও আশ্রয় দেয়। আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটি থেকে দোহা খুব দূরে নয়।
শেখ হামাদকে কাছ থেকে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা বলেছেন, ১৯৯৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের আগেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কাতারের প্রচলিত শক্তির উপাদান সীমিত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের প্রভাব বৃদ্ধি করতে ‘সফট পাওয়ার’–এ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।
এ কারণে ক্ষমতায় আসার পর প্রথমেই শেখ হামাদ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ক্রীড়াক্ষেত্রে পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাতে বিশাল বিশাল প্রকল্প শুরু করেন এবং এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেন। সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি দেশের সম্পদকে শুধু নিজের জনগণের সমৃদ্ধির উৎস হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রভাবের শক্তিতে রূপান্তর করেন।
পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে জটিল বিরোধ ও সংঘাত নিরসনে কাতারের কূটনীতি সফলভাবে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে।
২০০৮ সালে দোহা লেবাননের নেতাদের একত্র করে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদনে সহায়তা করে, যার ফলে দেশটি আরেকটি গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়।
উপসাগরীয় এই দেশ ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল এবং এমন নীতি গ্রহণ করেছিল, যা স্পষ্টভাবে এই অঞ্চলের জনগণের স্বাধীনতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারের পক্ষে ছিল।
দারফুর সংকট নিয়ে সুদানের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ৩০ মাস ধরে চলা আলোচনার পৃষ্ঠপোষকতা করে কাতার। এর ফলে ২০১১ সালে ‘দোহা ডকুমেন্ট ফর পিস’ স্বাক্ষরিত হয়।
ফিলিস্তিনের বিভক্ত দুপক্ষ হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখতেও পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে কাতার। পাশাপাশি ইয়েমেন ও সোমালিয়ার বিরোধ এবং ইরিত্রিয়া ও জিবুতির মধ্যকার বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রেখে কূটনীতির ক্ষেত্রে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দেশটি।
শেখ হামাদের শাসনামলেই কাতার আল–উদেইদ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এই আল–উদেইদ সামরিক ঘাঁটিতে। একই সঙ্গে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতৃত্বকেও আশ্রয় দেয়। আল–উদেইদ সামরিক ঘাঁটি থেকে দোহা খুব দূরে নয়।
ফিলিস্তিনের বিভক্ত দুপক্ষ হামাস ও ফাতাহর মধ্যে সংলাপ অব্যাহত রাখতেও পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে কাতার। পাশাপাশি ইয়েমেন ও সোমালিয়ার বিরোধ এবং ইরিত্রিয়া ও জিবুতির মধ্যকার বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখে কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
২০১২ সালে ইসরায়েলি যুদ্ধের পর গাজা উপত্যকা সফরকারী প্রথম আরব নেতা ছিলেন শেখ হামাদ। সেখানে তিনি ৪০ কোটি ডলারের অনুদানের মাধ্যমে আবাসন ও পুনর্গঠন প্রকল্প শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন।
কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা দেশটির রাজনৈতিক নীতিগুলোকে, বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারেনি। কারণ, সংঘাতের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা কাতারের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। এসব পক্ষের মধ্যে ইসরায়েলও রয়েছে।
উপসাগরীয় এই দেশ ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল এবং এমন নীতি গ্রহণ করেছিল, যা স্পষ্টভাবে এই অঞ্চলের জনগণের স্বাধীনতা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারের পক্ষে ছিল।
স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয়
প্রয়াত আমিরের শাসনামলে কাতারের উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এটি এমন একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছিল, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
কাতারকে নিয়ে শেখ হামাদের স্বপ্ন যখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে, সে সময়ে ২০১৩ সালে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন তাঁর ছেলে ও উত্তরসূরি শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। ছেলে দেশকে নিয়ে বাবার স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলছেন।