ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের ভোটদানের হারের ওপর নির্ভর করে নির্বাচনে তাঁরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। অনেক গণতান্ত্রিক দেশের মতো ইসরায়েলে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে আগামীকাল মঙ্গলবার ভোট দেবেন ইসরায়েলিরা। তবে নতুন সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ, কয়েক মাস কিংবা আরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। অনেকের মতে, ইসরায়েলের ৭৮ বছরের ইতিহাসে এটি হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি। অনেক ইসরায়েলি এই নির্বাচনকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর গণভোট হিসেবে দেখছেন।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নেতা। এবারের নির্বাচনে তিনি, তাঁর দল ও ক্ষমতাসীন জোট তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে হামলার চালানোর পর দেশটিতে এটিই প্রথম নির্বাচন। হামাসের হামলায় প্রায় ১২ শ মানুষ নিহত হয়। দুই শতাধিক ইসরায়েলিকে জিম্মিও করেছিল হামাস। এই হামলার জেরে গাজায় নির্বিচারে হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারায়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গাজা উপত্যকা। ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনে এসব হামলা এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়বে ভোটারদের সিদ্ধান্তে।
ইসরায়েলের নির্বাচনপদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রতিটি দল অগ্রাধিকার অনুযায়ী প্রার্থীদের একটি তালিকা তৈরি করে। ভোটাররা একটি দল বা প্রার্থীতালিকা বেছে নেন। সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দলের নেতা দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয় না। তাঁকে সরকার গঠন করতে হয়। দেশটির সংসদীয় পদ্ধতি জটিল। এতে ব্যাপক আলোচনা ও দর-কষাকষি করতে হয়।
নির্বাচনের দিন কী হয়, কারা ভোট দেয়
ইসরায়েলে নির্বাচনের দিন সরকারি ছুটি থাকে। স্কুল, সরকারি দপ্তর ও অনেক জনসেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকে। দেশের বেশির ভাগ এলাকায় স্থানীয় সময় সকাল সাতটায় ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা। শেষ হওয়ার কথা রাত ১০টায়। কিছু ছোট জনপদ, হাসপাতাল ও কারাগারে ভোট গ্রহণের সময় কিছুটা কম থাকে।
ভোটারদের নিবন্ধিত বাসস্থানের কাছাকাছি একটি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তাঁরা শুধু সেই কেন্দ্রেই ভোট দিতে পারেন। তবে সেনাসদস্য, কারাবন্দীসহ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সারা দেশে পাওয়া ভোটের অনুপাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন করা হয়। দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন প্রতি চার বছরে একবার হয়।
ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী সব ইসরায়েলি নাগরিক ভোট দিতে পারেন। এ জন্য বৈধ পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ইসরায়েলি পরিচয়পত্র ব্যবহার করা যায়। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের ভোটদানের হারের ওপর নির্ভর করে নির্বাচনে তাঁরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
অনেক গণতান্ত্রিক দেশের মতো ইসরায়েলে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। বেশির ভাগ নাগরিক বিদেশে থেকেও ভোট দিতে পারেন না।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সারা দেশে পাওয়া ভোটের অনুপাতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন করা হয়। দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন প্রতি চার বছরে একবার হয়। তবে এর চেয়ে কম সময়ের ব্যবধানেও নির্বাচন হতে পারে। পার্লামেন্ট ভেঙে যাওয়ায় সর্বশেষ ২০২২ সালে দেশটিতে নির্বাচন হয়। সেটি ছিল তিন বছরের মধ্যে পঞ্চম নির্বাচন।
পার্লামেন্টে জায়গা পেতে কোনো দলকে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এবারের নির্বাচনে প্রায় ১০টি দল এই ন্যূনতম সীমা পার করতে পারে বলে।
ইসরায়েলিরা একটি দলের প্রার্থীতালিকার পক্ষে একটি ভোট দেন। সারা দেশে কোনো দল যত শতাংশ ভোট পায়, সেই অনুপাতে আসন পায়। তবে পার্লামেন্টে জায়গা পেতে কোনো দল বা প্রার্থীতালিকাকে মোট বৈধ ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এবারের নির্বাচনে প্রায় ১০টি দল এই ন্যূনতম সীমা পার করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগামী ৪ নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে।
ইসরায়েলে কোনো একক দল কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়নি। ফলে দলগুলোকে সংসদীয় জোট করতে হয়। দলীয় নেতারা অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতাকে নিয়ে সরকার গঠনের জোট করার চেষ্টা করেন।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট সংসদীয় জোটগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা মূলত আলঙ্কারিক।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নেসেটের একজন সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। সাধারণত সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দল বা জোটের নেতাকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর অন্য জোটগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও জোট গড়ে সরকার গঠনের জন্য ওই প্রার্থী ২৮ দিন সময় পান। নেসেটে আস্থা ভোটে সেই সরকারের অনুমোদন পেতে হয়। দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারেন।
প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া দল বা জোটের নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তিনিও সরকার গঠনের চেষ্টার জন্য ২৮ দিন সময় পান। দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় একজন প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করতে পারেন। এই প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় পান। সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
অতীতে সরকার গঠনে ২০ থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। আর নির্বাচনের পর ৫০ দিনের কম সময়ে কোনো সরকার শপথ নেয়নি।
সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া নেতা একটি সরকার ও তার নীতিগত কর্মসূচি প্রস্তাব করতে পারেন। নেসেটে সেই প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষের চেয়ে বেশি ভোট পড়লে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেয়। ওই নেতা হন প্রধানমন্ত্রী। আইন অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সরকারও গঠন করা যায়। সে ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে যত ভোট পড়বে, বিপক্ষে তার চেয়ে কম ভোট পড়তে হবে। তবে নির্বাচনের পর গঠিত সরকারগুলো প্রায় সব সময়ই নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা পেয়েছে। অর্থাৎ অন্তত ৬১ জন সদস্যের সমর্থন পেয়েছে।
ইসরায়েলের নির্দলীয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে সরকার গঠনে ২০ থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। আর নির্বাচনের পর ৫০ দিনের কম সময়ে কোনো সরকার শপথ নেয়নি।
নির্বাচনের আগের সপ্তাহে বিভিন্ন জনমত জরিপে ভিন্ন ভিন্ন ফলের আভাস পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক গবেষণা বিভাগের প্রধান আসাফ শাপিরা এ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এটি ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য খুবই সমস্যার’।
অনেক ইসরায়েলি এই নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর গণভোট হিসেবে দেখছেন। নেতানিয়াহু, তাঁর লিকুদ পার্টি ও কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, এটা অনেকটাই নিশ্চিত। সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি নেতানিয়াহুর জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তিনিই নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন।