তেহরানের ইনকিলাব চত্বরে সমবেত মানুষের ভিড়ে কাঁদছেন নারীরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর সেখানে জড়ো হন তাঁরা। ১ মার্চ ২০২৬
তেহরানের ইনকিলাব চত্বরে সমবেত মানুষের ভিড়ে কাঁদছেন নারীরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর সেখানে জড়ো হন তাঁরা। ১ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা যেভাবে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করছে

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে সাধারণত কৌশলগত কিছু পরিভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। যেমন প্রতিরোধ, উত্তেজনা বৃদ্ধি, সামরিক চাপ, ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ও পারমাণবিক ঝুঁকি। এ পরিভাষাগুলোর সব কটিই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে পুরো বাস্তবতাটা উঠে আসে না।

এই যুদ্ধে ইরান কীভাবে লড়তে পারে এবং টিকে থাকতে পারে, তা বুঝতে হলে আমাদের সামরিক হিসাব-নিকাশের বাইরে তাকাতে হবে। আমাদের দেখতে হবে সেই নৈতিক জগতের দিকে, যার মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতা, ক্ষয়ক্ষতি এবং সর্বোপরি টিকে থাকার বিষয়টি বুঝে থাকে।

ইরান এমন কোনো সাধারণ রাষ্ট্র নয়, যার ওপর হামলা হয়েছে। বরং এটি এমন এক রাষ্ট্র, যার আদর্শিক ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরে শিয়া রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের শাহাদাত, আত্মত্যাগ ও পবিত্র প্রতিরোধের ধারণার ওপর গড়ে উঠেছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুদ্ধে শুধু অস্ত্র দিয়েই লড়াই হয় না; বরং বয়ান ও মূল্যবোধের ব্যাখ্যা নিজেও একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

পবিত্র রমজান মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে কট্টরপন্থীরা একের পর এক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে, এমনকি বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকার পরও। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুগতদের মধ্যে, বিশেষ করে আধা সামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর ভেতরে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা একজন ঐশী জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত এক আলেমের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘শহীদ’ হতে প্রস্তুত।

এর মানে এই নয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র একেবারে সুরক্ষিত। বরং বিষয়টি আরও জটিল ও উদ্বেগজনক। বাইরের হামলা এই রাষ্ট্রকে হয়তো ততটা দুর্বল করতে পারবে না, যতটা এর শত্রুরা আশা করে। এর বদলে এটি সেই প্রতীকী ও নৈতিক বয়ানকে আবারও জাগিয়ে তুলতে পারে, যার মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কয়েক দশক ধরে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে এবং দেশে ও বিদেশে নিজেদের দমন-পীড়নকে বৈধতা দিয়ে আসছে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র কখনোই শুধু একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল না। শুরু থেকেই এটি নিজেকে একটি নৈতিক প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা পবিত্র ইতিহাসের সঙ্গে সার্বভৌমত্বকে একীভূত করেছে। সেই ইতিহাসের মূল আবেগের ও প্রতীকী ভান্ডারটি রয়েছে শিয়া মুসলিমদের স্মৃতিতে, বিশেষ করে ৬৮০ সালের কারবালার প্রান্তরে। সেখানে উমাইয়া বাহিনীর হাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রা.) ও তাঁর ক্ষুদ্র অনুসারী দল নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন।

গায়ে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে ঈদের জামাতে ইরানি নারী। গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ, তেহরান, ২১ মার্চ ২০২৬

শিয়া ঐতিহ্যে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি অন্যায্য ক্ষমতারোহণ, নির্দোষের ভোগান্তি, ন্যায়সংগত প্রতিরোধ ও মুক্তির জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি বিশ্বাসীদের মনে করিয়ে দেয় যে নিপীড়নের শিকার মানেই পরাজয় নয়, ভোগান্তি মানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো হতে পারে এবং মৃত্যুই হয়ে উঠতে পারে একটি কালের সাক্ষী।

এ কারণেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব বোঝাপড়ায় শাহাদাত (আত্মত্যাগ) কোনো গৌণ বিষয় নয়, বরং এটি তাদের কেন্দ্রীয় কাঠামোগত মূল্যবোধ। বছরের পর বছর ধরে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ন্যায়ের পক্ষে থাকার কারণে ভুক্তভোগী হওয়ার এবং সাম্রাজ্যবাদ (ইস্তেকবার), আধিপত্যবাদ, অবমাননা ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পবিত্র সংগ্রামের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে বৈধতা অর্জন করে আসছে।

অংশত আত্মত্যাগের পবিত্রতার ওপর গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থা যেকোনো আক্রমণকে তার নিজস্ব নৈতিক জগতের মধ্যে মানিয়ে নিতে পারে। বাইরে থেকে যা ধ্বংসযজ্ঞ হিসেবে দেখা যায়, ভেতর থেকে তা কালের সাক্ষী, সহনশীলতা ও বিশ্বস্ততার বয়ান হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে, যেখানে মৃত্যু নিজেই রাজনৈতিকভাবে একধরনের অর্জন হয়ে ওঠে।

যে কৌশলে এগোচ্ছে ইরান

এটি কোনো জল্পনা নয়। বর্তমান যুদ্ধে ইরানের কৌশল দম ধরে রাখা এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা—শত্রুদের চেয়ে বেশি দিন টিকে থাকা, আঘাত সামলে ওঠা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করা এবং এই বাজি ধরা যে ইরানের আগেই ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক সংকল্প ভেঙে পড়বে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিমান হামলার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান সরকারের ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যায়নি।

আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতিও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে টিকে থাকার ও আত্মত্যাগের একটি টেকসই সংস্কৃতি রেখে গেছে। সেই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বাহ্যিক চাপ সামলে টিকে থাকার অভিজ্ঞতাও যুক্ত হয়েছে, যদিও এর জন্য ইরানিদের বিপুল মানবিক মূল্য চোকাতে হয়েছে।

অবশ্যই সব সংহতি ধর্মতাত্ত্বিক নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ঘৃণা করেন, এমন অনেক ইরানিও বিদেশি হামলার বিরোধিতা করতে পারেন। এর কারণ প্রজাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য নয়, বরং জাতীয়তাবাদ এবং (যুদ্ধের মাধ্যমে) পুরো জাতিকে শাস্তি দেওয়ার ভয়, শোক ও বিভীষিকা। আর ঠিক এখানেই মূল বিষয়টি লুকিয়ে আছে। বিদেশিদের চাপিয়ে দেওয়া সহিংসতা দেশের ভেতরের নৈতিক সীমারেখাকে ঝাপসা করে দিতে পারে। এটি জনপরিসরকে সংকুচিত করতে পারে, অবরুদ্ধ থাকার মানসিকতা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং রাষ্ট্রকে আবারও নিপীড়কের ভূমিকা আড়াল করে জাতির রক্ষক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার সুযোগ করে দিতে পারে।

তেহরানে আইআরজিসি মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনির জানাজায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি হাতে শোকাহত জনতা। ২১ মার্চ ২০২৬

অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ যখন বিদেশি হুমকির দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রায়ই লাভবান হয়। শান্তিকালীন এর ব্যর্থতাগুলো উন্মোচিত হয়—দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক পতন, জবরদস্তিমূলক শাসন। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে, বিশেষ করে বিদেশি ও বেআইনি হামলার মুখে এটি তার পুরোনো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে পারে—একটি অযোগ্য স্বৈরাচারী রাষ্ট্র নয়, বরং প্রতিরোধের এক সংগ্রামরত রক্ষক।

এর মানে এই নয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মতত্ত্ব সর্বজনীনভাবে সম্মতি উৎপাদনে সক্ষম। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ইঙ্গিত দেয়, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে ক্রমেই কমে আসা অনুগত গোষ্ঠী এবং বৈধতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। অনেক ইরানি দীর্ঘকাল আগেই রাষ্ট্রের পবিত্র বয়ানের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব কার্যকর হওয়ার জন্য সর্বজনীন বিশ্বাসের প্রয়োজন হয় না। ভোগান্তিকে সংহতিতে রূপান্তর করার জন্য এর প্রয়োজন পর্যাপ্তসংখ্যক বিশ্বাসী, পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান, পর্যাপ্ত আচার-অনুষ্ঠান, পর্যাপ্ত ভয় এবং পর্যাপ্ত যুদ্ধ।

আর এ বিষয়টিই বর্তমান যুদ্ধকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি মনে করে যে প্রবল শক্তি প্রয়োগ করলেই তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের মূল ‘অর্থ’ মুছে ফেলতে পারবে, তবে সম্ভবত সেই ‘রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক’ ব্যবস্থাটি বুঝতে মারাত্মক ভুল করছে, যার বিরুদ্ধে তারা লড়ছে।

সুবিধা নেবে ইরানের শাসকগোষ্ঠী

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব বাগাড়ম্বরও কোনো কাজে আসেনি। ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ যে দাবি তিনি জানিয়েছেন, তা যুদ্ধকে সীমিত কৌশলগত লক্ষ্যের গণ্ডি পেরিয়ে অবমাননা ও নিরঙ্কুশ পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেয়। এটি শুধু উত্তেজনাই বাড়ায় না; বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ঠিক সেই ধরনের এক বহিঃশত্রু এনে দেয়, যাকে নিজেদের বয়ানে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা তারা ভালো করেই জানে।

একটি ধর্মনিরপেক্ষ কৌশলগত চিন্তাধারায়, সহিংসতা বা হামলা কোনো শক্তির সক্ষমতা ধ্বংস করার মাধ্যমে তাকে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তাধারায়, সহিংসতা পবিত্র উদ্দেশ্যকে সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে সেই শক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

একটি মতাদর্শিক রাষ্ট্র, যা নিজেকে ‘পবিত্র প্রতিরোধ’ (স্যাক্রেড রেজিস্ট্যান্স)-এর আয়নায় দেখে; তারা হয়তো তাদের কমান্ডার, অবকাঠামো বা ভূখণ্ড হারাতে পারে, কিন্তু বিনিময়ে প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় অর্জন করে। আর সেটি হলো ‘শাহাদাতের’ ধারণার নতুন বয়ান।

ঈদের নামাজের পর আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনির জানাজায় অংশ নেন শোকাহত জনতা। তেহরান, ২১ মার্চ ২০২৬

মতাদর্শিক রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের এটিই অন্যতম এক ট্র্যাজেডি। বাইরে থেকে তাদের ওপর যত বেশি আক্রমণ করা হয়, তাদের ভেতরকার টিকে থাকার আখ্যানগুলো পুনরুদ্ধার করা তাদের জন্য ততটাই সহজ হয়ে ওঠে।

এসবের কোনোটির অর্থ এই নয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নির্মমতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে বা তাদের আত্মত্যাগের ধর্মতত্ত্বকে মহিমান্বিত করা হচ্ছে। এই ধর্মতত্ত্বকে প্রায়ই নেতিবাচক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে; যেখানে বিশ্বাসের ভাষায় মৃত্যুকে পবিত্র আখ্যা দিয়ে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নৈতিক সমালোচনার জন্য স্পষ্টতা প্রয়োজন। আমরা যদি বুঝতে চাই কীভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে আছে, তাহলে আমাদের দেখতে হবে যে তাদের এই মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা কেবল সামরিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং প্রতীকীও। এর সার্থকতা নিহিত রয়েছে ক্ষতিকে নৈতিক কর্তৃত্বে রূপান্তর করার ক্ষমতার মধ্যে।

এ কারণেই ধর্মীয় মাত্রাটি এত গুরুত্বপূর্ণ। এটা এ জন্য নয় যে এই যুদ্ধ শুধুই ধর্ম নিয়ে, বরং ধর্ম এখানে ভোগান্তিকে একটি রাজনৈতিক রূপ দিতে সাহায্য করে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র তখন শক্তিশালী হয়, যখন তারা পাল্টা আঘাত করতে পারে; আর তারা ঠিক তখনই সমান শক্তিশালী, যখন তারা পর্যাপ্ত মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে আক্রমণ সহ্য করাটাও একধরনের বিজয়।

ইরানের ওপর এই হামলা একটি জোরালো বৈপরীত্য তৈরি করতে পারে। এটি হয়তো রাষ্ট্রের বস্তুগত ভিত্তিগুলোকে দুর্বল করে দেবে, কিন্তু একই সঙ্গে সেই পবিত্র বয়ানকে আরও পুষ্ট করবে, যার ওপর ভর করে এই রাষ্ট্র আজও টিকে আছে।

লেখা: হোসেন দাব্বাক, সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন