
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত যুদ্ধের রূপ ও উদ্দেশ্য শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। যুদ্ধের গোড়ার দিকে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য যেখানে ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কিংবা ইরানকে পূর্ণ আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, সেখানে পরিস্থিতি গড়িয়ে এখন তা এসে ঠেকেছে কেবল হরমুজ প্রণালি আবার সচল করা। তবে এ সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক খেসারত দিতে হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় উভয় পক্ষের চাওয়া-পাওয়ার সমীকরণ পাল্টে গেছে। কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মেহরান কামরাভার মতে, শুরুতে ওয়াশিংটন যেসব বড় লক্ষ্যের কথা বলেছিল, তা এখন সীমিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু কেবল হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা। অন্যদিকে তেহরান কেবল সামরিক প্রতিরোধেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা ওমানের পাশাপাশি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর যৌথ প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চায়। পাশাপাশি নিজেদের অর্থনীতিকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিকে তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত খনিজ তেলের একটি বড় অংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পণ্য সরবরাহ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। টানা সংঘাতের ফলে খাদ্যপণ্যে বড় ধরনের সংকট এখনো প্রকট না হলেও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ও বাণিজ্যিক সামগ্রীর সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাজারে ভারী নির্মাণসামগ্রী, ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি ব্যবহারের বিভিন্ন সরঞ্জামের ঘাটতি ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে, যা এ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে দুই পক্ষের সামরিক সংঘাত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের অভ্যন্তরে পরমাণু কেন্দ্র ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়েছে, তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও ড্রোন আগ্রাসনের কারণে পুরো নৌপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এ যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিত্যনতুন কৌশল খুঁজলেও কেবল আকাশপথে বোমা বর্ষণ করে তেহরানকে নতি স্বীকার করানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে দুই শক্তির এই রক্তক্ষয়ী উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ও শান্তি এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।