গত বছর পাকিস্তানে প্রথম সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, ৩ আগস্ট ২০২৫
গত বছর পাকিস্তানে প্রথম সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, ৩ আগস্ট ২০২৫

ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান কেন পাকিস্তানে ছুটছেন

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় সফরে পাকিস্তান যাচ্ছেন। তাঁর এই সফর যেমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের, তেমনি এটি নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনারও একটি বার্তা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর গতকাল মঙ্গলবার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে পাকিস্তান গেলেন পেজেশকিয়ান। সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। সেখান থেকে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে ৬০ দিনের একটি রূপরেখা পাওয়ার কথা জানায় পাকিস্তান ও কাতার। এর এক দিন পরই পেজেশকিয়ানের এই সফরের কথা সামনে এল।

এই সফরের সময়টি মোটেও কাকতালীয় নয়। পেজেশকিয়ান এমন এক সময়ে ইসলামাবাদে আসছেন, যখন তিনি মাত্র তাঁর মেয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চুক্তিতে সই করেছেন। ২০১৫ সালে পরমাণু চুক্তির (জেসিপিওএ) সময় দেশের ভেতরে যেমন রাজনৈতিক বিভাজন দেখা গিয়েছিল, এই চুক্তির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে।

২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) ছিল একটি যুগান্তকারী পরমাণু চুক্তি। ইরান এবং বিশ্বের ছয় পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে এই চুক্তি হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তির বিনিময়ে নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়েছিল তেহরান। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র।

জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক রেজা খানজাদেহ আল-জাজিরাকে বলেন, সমঝোতা স্মারকে সই করার পরপরই পেজেশকিয়ানের ইসলামাবাদে যাওয়া অনেক কিছুর ইঙ্গিত দেয়। এই নাজুক চুক্তিকে তাঁর রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তর করা প্রয়োজন। দেশের ভেতরে, সরকারে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই পুঁজি তাঁর দরকার। পাকিস্তানের চেয়ে এই সফর তাঁর বেশি প্রয়োজন।

সফরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সঙ্গে দেখা করবেন পেজেশকিয়ান। সুইজারল্যান্ডের আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছিলেন শাহবাজ।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির সিনেট চেয়ারম্যান ইউসুফ রাজা গিলানি, জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করবেন।

উভয় পক্ষ সুইজারল্যান্ডের আলোচনা নিয়ে কথা বলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্তনিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর উপায় নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

২০২৫ সালের মে মাসে ইরান সফর করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সেখানে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর এক হামলায় নিহত হন ইরানের এই সর্বোচ্চ নেতা

সংকটের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্ক

ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটি পেজেশকিয়ানের দ্বিতীয় পাকিস্তান সফর। ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়। এরপর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে পাকিস্তানকেই বেছে নিয়েছিলেন পেজেশকিয়ান। রাজধানী ইসলামাবাদে যাওয়ার আগে তিনি পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাহোরে গিয়েছিলেন। সে সময় দুই দেশের মধ্যে ১২টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

ইসলামাবাদে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএর ব্যুরোপ্রধান আফজাল রেজা বলেন, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান নিজে এসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য প্রথম দেশ হিসেবে পাকিস্তানকেই বেছে নিয়েছেন। মধ্যস্থতার মিশনে পাকিস্তানের রাজনীতিক, সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষের প্রতিশ্রুতি, সাহায্য ও চেষ্টার জন্য তিনি এই প্রশংসা করছেন।

পাকিস্তান ও ইরানের সম্পর্ক সব সময় এতটা মধুর ছিল না। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। সশস্ত্র গোষ্ঠী জইশ আল-আদেলকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছিল তেহরান। এর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাল্টা জবাব দেয় পাকিস্তান। ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আস্তানায় ধারাবাহিক হামলা চালায় তারা। এই সংঘাতকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক উত্তেজনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এর জেরে দুই দেশই নিজেদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। অবশ্য উভয় পক্ষই দ্রুত এই অবস্থান থেকে সরে আসে। উত্তেজনা কমাতে ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমিরআবদুল্লাহিয়ান ইসলামাবাদ সফর করেন। এরপর ধীরে ধীরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়।

কয়েক মাস পর ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও আমিরআবদুল্লাহিয়ান নিহত হন। এরপর অনুষ্ঠিত আগাম নির্বাচনে জয়ী হন পেজেশকিয়ান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার সময় পাকিস্তানের সঙ্গে একটি নাজুক কিন্তু জোড়াতালি দেওয়া সম্পর্কের উত্তরাধিকার পান তিনি।

খানজাদেহ বলেন, পাকিস্তান এখন আর শুধু বার্তা আদান–প্রদানের মাধ্যম নয়। ইরান বুঝিয়ে দিচ্ছে, এই প্রক্রিয়ার ফলাফলে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে ইসলামাবাদ।

সার্বভৌম অবস্থান থেকে যুক্ত হচ্ছে ইরান

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর অন্তত সাতবার ফোনে কথা বলেছেন শরিফ ও পেজেশকিয়ান। এসব কথোপকথন অনেক সময় এক ঘণ্টা পর্যন্তও গড়িয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা চেষ্টার অংশ হিসেবে দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির অন্তত দুবার তেহরান সফর করেছেন। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও কয়েকবার সেখানে গেছেন।

এই কূটনীতির চূড়ান্ত রূপ পায় ১৮ জুন। ওই দিন ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। এতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সই করেন শাহবাজ শরিফ। দুই নেতার মধ্যে সর্বশেষ ফোনালাপ হয় ১৮ জুন, যেদিন এমওইউ সই হয়েছিল। ৩০ মিনিটের বেশি সময় ধরে চলা ওই আলাপেই পেজেশকিয়ানকে ইসলামাবাদ সফরের আমন্ত্রণ জানান শরিফ।

গত রোববার শেষ হওয়া বার্গেনস্টকের প্রথম দফার আলোচনা থেকে বেশ কয়েকটি ফল এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক কমিটি গঠন, পরমাণু ইস্যু ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কাজ করার জন্য দল তৈরি, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যোগাযোগের সূত্র এবং লেবাননের সংঘাত নিরসন কাঠামো। চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে কারিগরি আলোচনা চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের নথি দেখাচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের তেহরানে, ১৮ জুন ২০২৬

খানজাদেহ যুক্তি দেন, বার্গেনস্টকে কারিগরি আলোচনা চললেও এই আলোচনার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দিচ্ছে ইসলামাবাদ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক আস্থা তৈরির যে কাজ ইসলামাবাদ করতে পারে, তা বার্গেনস্টক পারে না।

খানজাদেহ আরও বলেন, কারিগরি আলোচনার মাধ্যমে কোনো কাজের রূপরেখা, সময়সূচি এবং যাচাই-বাছাইয়ের ভাষার খসড়া করা যায়। তবে চুক্তির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া বা বিরোধীদের সামলানোর জন্য নেতাদের যে রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রয়োজন হয়, কারিগরি আলোচনা তা তৈরি করতে পারে না।

ইরানে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, ইরানের প্রেসিডেন্টের এই সফর নিয়ে তিনি সতর্ক আশাবাদী। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরমাণু অস্ত্রের পথে না হাঁটতেই তেহরান স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। তারা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তানীতি মেনে চলবে। তাঁর মতে, এই চুক্তির বড় অর্জন হলো নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি।

দুররানি আরও বলেন, ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে ৬০ দিনের জন্য তেল রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে ইরান। এটি একটি বড় স্বস্তির বিষয়।

লেবানন ইস্যুতে দুররানি বেশ সোজাসাপটা কথা বলেছেন। এই সাবেক দূতের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া যেকোনো সমঝোতাকে ইসরায়েল যেন সম্মান দেখায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। তিনি আরও বলেন, ইসলামাবাদ এমওইউর প্রথম অনুচ্ছেদটিতে লেবাননসহ এই অঞ্চলের শান্তির বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে বলা আছে। ইসরায়েল যদি মনে করে যে তারা এই চুক্তির অংশ নয়, তবে তা তাদের মাথাব্যথা। বিষয়টি তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই বুঝে নেবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পেজেশকিয়ানের এই সফর পাকিস্তানের কূটনৈতিক মর্যাদাকেও বাড়িয়েছে। খানজাদেহ বলেন, প্রকাশ্যে ইসলামাবাদকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ইরান আসলে প্রমাণ করে দিল যে পাকিস্তান আর শুধু বার্তাবাহক নয়, তারা এখন এই অঞ্চলের একজন স্বীকৃত মধ্যস্থতাকারী।

ইরানে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি আরও বলেন, পেজেশকিয়ানের জন্যও এই সফর অভ্যন্তরীণভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে পেজেশকিয়ান প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন যে কূটনীতি মানেই আত্মসমর্পণ নয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সাড়া দিচ্ছে না; বরং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান থেকেই এতে যুক্ত হচ্ছে।