ইরানে হামলা চালিয়ে দ্রুত সাফল্য পাওয়ার পরিকল্পনা সফল হয়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ‘চাল’ চেলেছে। ইরানের কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটনের। দেশটির শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্রোহী কুর্দি সংগঠনগুলোর হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শুরুতে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালানো হবে কি না এবং হামলার কৌশল কী হতে পারে—এসব বিষয়ে গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। এ আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরান-ইরাক সীমান্তে ইরানের কুর্দি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হাজারো যোদ্ধা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। ইরাকের স্বশাসিত কুর্দিস্তান ইরানের বিদ্রোহী কুর্দিদের মূল ঘাঁটি। কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মূলত ইরান-ইরাক সীমান্ত এলাকায় তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় এখন তারা ইরানের ভেতরেও হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, ইরানের সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করা।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের দাবি, গত শনিবার শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার পর ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরোধীদের সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়াটাই হবে কুর্দি সশস্ত্র তৎপরতার মূল লক্ষ্য। তবে নাম প্রকাশ না করে সূত্রগুলো বলেছে, এ অভিযান এবং এর সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কুর্দি গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। পাশাপাশি ইরাকের ইরবিল ও বাগদাদের নেতারাও গত কয়েক দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রের জোগান দেবে সিআইএ। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন অস্ত্র ও প্রশিক্ষণে ইরানের ভেতরে হামলা চালাবে ও অরাজকতা সৃষ্টি করে শাসকগোষ্ঠীকে নাস্তানাবুদ করবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই কুর্দিদের বেশ কয়েকটি সংগঠন বিবৃতি দিয়ে হামলাকারীদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তারা ইরানের সেনাবাহিনীকে সরকারের পক্ষ ত্যাগ করে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। এমন পরিস্থিতিতে কুর্দি সংগঠনগুলোর ওপর হামলা শুরু করেছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কুর্দিস্তান গণতান্ত্রিক দলের (কেডিপিআই) সভাপতি মুস্তফা হিজরির সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে ইরানের কুর্দিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। এর আগে ইরাকের কুর্দি নেতাদের সঙ্গেও রোববার আলোচনা করেন ট্রাম্প। কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও কুর্দিরা সম্মিলিতভাবে স্থল অভিযানকে এগিয়ে নিতে পারে, তা নিয়ে কথা বলেন তিনি।
কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করবে ইরানের কুর্দিরা। এমন প্রত্যাশার কথা সিএনএনকে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ কুর্দি কর্মকর্তা। এখন পর্যন্ত পাঁচ দিনের যুদ্ধে কোনো স্থল অভিযান চালায়নি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ঘাটতি পূরণেই কুর্দিদের শরণাপন্ন হচ্ছে এই দুই শক্তিধর দেশ।
ইরাক থেকে যেকোনো ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় মাপের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার প্রয়োজন হবে। পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরবিলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াইরত আন্তর্জাতিক জোটকে সহায়তা প্রদান করে আসছে।
ইরাকি কুর্দিস্তানে সক্রিয় কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কাজের ইতিহাস রয়েছে। তবে এই গোষ্ঠীগুলোর ঘন ঘন আনুগত্য পরিবর্তন ও আদর্শগত পার্থক্যের কারণে মাঝেমধ্যেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
ইরাক যুদ্ধ ও জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই—উভয় ক্ষেত্রেই ইরাকের নির্দিষ্ট কিছু কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ইরানের অভ্যন্তরে লড়াইয়ে এই কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কতটা সফল হতে পারবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। এসব গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের রণক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন।
সিএনএনের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি সূত্র জানিয়েছে, এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো কুর্দি সশস্ত্র বাহিনী ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর মোকাবিলা করবে, যাতে দেশটির শহরগুলোতে নিরস্ত্র ইরানিদের গণ–অভ্যুত্থান সহজতর হয়।
ইরানের অভ্যন্তরে কুর্দিদের এ ধরনের সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো কীভাবে গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি। ইরানি কুর্দিদের এমন একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান ইরানের স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
এটি দেশটির বালুচ জাতিগত সংখ্যালঘুদের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে নতুন করে ইন্ধন জোগাতে পারে। উল্লেখ্য, ইরানের এই বালুচ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের অশান্ত প্রদেশ বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
বালুচ স্বাধীনতার লক্ষ্যে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ ইসলামাবাদ (পাকিস্তান সরকার) মেনে নেবে না—এমনটাই প্রবলভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার কট্টর সমর্থক তুরস্ক মনে করে, দামেস্ক সরকার ও কুর্দি বাহিনীর মধ্যে একীভূতকরণ চুক্তিটি সিরিয়াজুড়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক হুমকি দিয়ে জানিয়েছিল যে সিরীয় কুর্দি ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) যদি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসতে রাজি না হয়, তবে উত্তর সিরিয়ায় তারা নিজস্ব সামরিক অভিযান চালাবে।
নিষিদ্ধঘোষিত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে আঙ্কারা। এ অবস্থায় নিজের সীমান্তের কাছে অন্য কোনো কুর্দি গোষ্ঠীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার বিষয়টি তুরস্কের সহানুভূতি পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।