
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল বহনকারী দুটি ট্যাংকার লোহিত সাগরে গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এতে হরমুজ প্রণালির পর বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব দৃশ্যমান হলো।
সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে গতকাল মঙ্গলবার চীন ও ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল তেলবাহী ট্যাংকার দুটি। কিন্তু বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে ভারত মহাসাগরের দিকে না গিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে সুয়েজ খালের দিকে চলে যায় ট্যাংকার দুটি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আজ বুধবার ভোরে জানিয়েছে, টানা ১১তম রাতের মতো তারা ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
আজ ভোরে তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ রাজধানী তেহরানের আকাশে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করার কথা জানিয়েছে।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় শহর চাবাহার ও কোনারাকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা বুশেহরেও দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এর আগে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। একই সময়ে পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজও হামলার শিকার হয়।
ইরান দাবি করেছে, বাহরাইনে অ্যামাজনের (মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান) আঞ্চলিক ডেটা সেন্টারের অবকাঠামোতে তারা হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে অ্যামাজন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও স্বাধীনভাবে এ দাবি যাচাই করতে পারেনি।
ইরান–সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী গত সোমবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়। এতে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল–মানদেব দিয়ে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানের ওপর হামলা শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার মাধ্যমে সেখানে ইরান দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। এখন তা বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে।
জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে হুতিরা হুমকি দিয়ে বলেছে, সৌদি আরবের তেলবোঝাই বা খালাস করে—এমন যেকোনো জাহাজে তারা হামলা চালাবে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিনের কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে এনে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করছিল সৌদি আরব। ফলে যুদ্ধ চলাকালে লোহিত সাগর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনের প্রধান বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল।
বাব আল-মানদেব বন্ধ হওয়ার পর গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম আবারও ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এখন পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করেনি। তবে তারা এমন পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে।
ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, ‘এখন পর্যন্ত এমন কিছু ঘটেনি। যদি এমন কিছু ঘটে, তাহলে আমরা সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
ট্রাম্প জানান, ইরানের হামলায় এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন গত কয়েক দিনে জর্ডান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় নিহত হন।
ক্রমবর্ধমান জ্বালানি দামের কারণে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।