মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

আল–জাজিরার এক্সপ্লেইনার

মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন দেশের পরমাণু কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলো কীভাবে গড়ে উঠেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ৩০ বছর মেয়াদি একটি পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশটিকে পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

গত বুধবার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান পারমাণবিক সহযোগিতাবিষয়ক ‘১২৩ চুক্তি’তে সই করেন। এর মধ্য দিয়ে চুক্তিটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।

এ চুক্তি মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বিদেশে পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুমতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শক্তি আইনের অনুচ্ছেদ ১২৩-এর অধীন মার্কিন সরকার এ ধরনের চুক্তিগুলো করে থাকে।

সৌদি–মার্কিন চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর বেশির ভাগই আপাতত অজানা। তবে কিছু বিশ্লেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ইতিমধ্যে অস্থির হয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা রোধ করার মতো পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা এ চুক্তিতে রয়েছে কি না তা নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী। তবে পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধে কাজ করা ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ (আইএইএ) এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে জড়িত ছিল না। তাই এ চুক্তির ক্ষেত্রে সুরক্ষা বিধিনিষেধ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তা অস্পষ্ট। এ ছাড়া সৌদি আরব নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের (এনএসজি) সদস্য নয়। পারমাণবিক উপাদান ও প্রযুক্তির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা ৪৮টি দেশের একটি গোষ্ঠী এটি। ফলে দেশটি কীভাবে মূল পারমাণবিক প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়াম পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে এ চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান বেশ কয়েকটি পারমাণবিক কর্মসূচির সর্বশেষ সংযোজন মাত্র, যার অনেকগুলোই বেসামরিক। এসব কর্মসূচি সম্পর্কে আর যা জানা যায়:

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব কিসে সম্মত হয়েছে

চুক্তিতে ঠিক কী রয়েছে তা অস্পষ্ট। তবে একটি দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তি হিসেবে এটি আশা করাই যায় যে সৌদির পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক চুল্লির চাহিদার সীমার মধ্যে থাকবে। এ ছাড়া এ কর্মসূচি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী বা তার কাছাকাছি স্তরে পৌঁছাবে না। বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে মার্কিন পরিদর্শকদের মাধ্যমে তদারকির একটি প্রক্রিয়া এ চুক্তিতে থাকতে পারে।

বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এমন কোনো দেশের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে না, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।’

ওয়েস্টিংহাউসের মতো পারমাণবিক চুল্লি প্রস্তুতকারক মার্কিন কোম্পানিগুলো এ চুক্তি থেকে লাভবান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চুক্তিটি এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পেশ করা হবে। এটি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারে। তবে বিরোধিতাকারী আইনপ্রণেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ৯০ দিনের পর্যালোচনার সময়সীমা শেষে চুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে।

মধ্যপ্রাচ্যে কোন দেশগুলোর পারমাণবিক কর্মসূচি রয়েছে

২০২৫ সালে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় এক দিনের বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই দুই মিত্র প্রতিপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটা যুদ্ধ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা। তবে তেহরান বারবার জোর দিয়ে বলে এসেছে যে তারা শুধু বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি বজায় রাখছে।

১৯৫৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ কর্মসূচি চালু করেন। এটির মূল লক্ষ্য ছিল, পারমাণবিক প্রযুক্তিকে যুদ্ধের বদলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসার মতো ভালো কাজে ব্যবহার করা। এ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ১৯৫৭ সালে ইরান তার প্রথম পারমাণবিক কাজ শুরু করে। আর বিশ্বের কোনো দেশ যেন এ প্রযুক্তি দিয়ে পারমাণবিক বোমা বানাতে না পারে, তার নজরদারি ও তদারকির জন্য ওই বছর আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আইএইএ’ গঠন করা হয়। ইরান ১৯৭৪ সালে এনপিটিতেও স্বাক্ষর করে।

ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সে সময় জার্মান কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল। তবে ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে আইএইএ শনাক্ত করে, ইরান পাকিস্তানের সাহায্যে নাতাঞ্জ, ইস্পাহান, ফোর্দোয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। ফলে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ করছে বলে অভিযোগ ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এমন কোনো দেশের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে না, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে।
মার্কো রুবিও, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কয়েক বছর ধরে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পাশাপাশি সাইবার হামলা চালানো এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যার মাধ্যমে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু বানায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

২০০৩ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত) ফতোয়া জারি করে ঘোষণা করেন যে তাঁর দেশ পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ করবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়াদে ২০১৫ সালে ইরান ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)’ নামে একটি পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তিতে তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মাত্র ৩ শতাংশের কিছু বেশিতে সীমিত রাখতে সম্মত হয়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী চুল্লির জন্য যথেষ্ট; কিন্তু পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক কম।

ইরান আইএইএকে তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও অভূতপূর্বভাবে প্রবেশের অনুমতি দেয়। এটি আজ পর্যন্ত কোনো দেশে আইএইএর পাওয়া সবচেয়ে নিবিড় তদারকি সুবিধা বলে মনে করা হয়। আইএইএ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার এ সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ইরান চুক্তি মানছে এবং কম মাত্রার সমৃদ্ধকরণ বজায় রেখে চলেছে।

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে দাবি করেন যে চুক্তিটি অস্পষ্ট এবং এটি ইসরায়েলের জন্য হুমকি তৈরি করছে। এ অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে এবং ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জবাবে ইরানও বৃদ্ধি করতে শুরু করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা।

২০২৫ সালের জুনে আইএইএর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ৪০০ কেজির বেশি ইউরেনিয়াম মজুত করেছে, যা অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের কাছাকাছি। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু করে।

ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ২০২৫ সালের মার্কিন বোমাবর্ষণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আগস্টে জাতিসংঘও ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তা সত্ত্বেও গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল আবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে।

সৌদি–মার্কিন চুক্তিটি এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পেশ করা হবে। এটি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় রাজনৈতিক দলের আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারে। তবে বিরোধিতাকারী আইনপ্রণেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েল

ইসরায়েল তার পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি না, জানাতে অস্বীকার করে। তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র উন্নত পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশ বলে মনে করা হয়। এ বিষয়ে দেশটির নীতি অত্যন্ত অস্পষ্ট।

ইসরায়েল এনপিটি স্বাক্ষরকারী নয়। ফলে আইএইএ তাদের সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে পারে না। ১৯৮০-এর দশক থেকে ইসরায়েল সংস্থাটির কাছে বিশদ তথ্য জমা দিতে সরাসরি অস্বীকার করে আসছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নিউকেসিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ (এনটিআই)-এর মতে, ১৯৬০-এর দশক থেকে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক ওয়ারহেড প্রায় ৯০টি। ইসরায়েলের কাছে আরও ৩০০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম মজুত রয়েছে।

ধারণা করা হয়, ১৯৭৯ সালে বর্ণবাদী শাসনামলের দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে মিলে ইসরায়েল তার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল। দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্র হলো দক্ষিণ ডিমোনা শহরের কাছে অবস্থিত শিমন পেরেস নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার। ১৯৫৭ সালে ফ্রান্সের সহায়তায় এ কেন্দ্র তৈরি করা হয়।

ইসরায়েল দাবি করে, ডিমোনা চুল্লিটি বেসামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। তবে ১৯৮০ সালে একজন ইসরায়েলি তথ্য ফাঁসকারী ওই কেন্দ্র থেকে গণমাধ্যমের কাছে নথিপত্র এবং ছবি প্রকাশ করে, যা ইসরায়েলের উন্নত পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে দীর্ঘদিনের সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণ করে। ২০২৫ সালের স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, ডিমোনা কেন্দ্রের সম্প্রসারণ কাজ চলছে। এমনকি যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাচ্ছিল, তখনো।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০০৯ সালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘১২৩ চুক্তি’ স্বাক্ষর করে তাদের সম্পূর্ণ বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি শুরু করে। দেশটি জানায় যে তারা দেশীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করবে না; যা পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদান। দেশটি এনপিটিও স্বাক্ষরকারী।

বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলো আমিরাতের পারমাণবিক অবকাঠামোর মূল কেন্দ্র। ২০১২ সালে এ বিশাল কেন্দ্রটি নির্মিত হয় এবং এতে দক্ষিণ কোরিয়ার নকশা করা চারটি চুল্লি রয়েছে, যা মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

প্ল্যান্টটি তৈরি করতে এবং স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে মার্কিন বিশেষজ্ঞরাও জড়িত ছিলেন। বারাকাহ প্রায় ৫,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। আমিরাতের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এটি। আইএইএর এ কেন্দ্রে পূর্ণ প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং রিয়েল-টাইম ক্যামেরা অ্যাক্সেসের মাধ্যমে তারা সেখানকার কার্যক্রম নজরদারি করতে পারে।

তুরস্ক

তুরস্কের নিজস্ব কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন করছেন বলে মনে হচ্ছে।

ন্যাটো মিত্র তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। নিজস্ব পারমাণবিক বোমা না থাকায় দেশটি সম্ভাব্য শত্রুদেশের আক্রমণ বা হুমকি থেকে বাঁচতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের এ পারমাণবিক ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করে আসছে। তুরস্কও এনপিটি স্বাক্ষরকারী দেশ।

তুরস্ক আক্কুয়ু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে তার বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামো বজায় রেখেছে। কেন্দ্রটি রাশিয়া নকশা করেছে ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। এটি ৪,৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ।

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, তাঁর দেশ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারে, যা এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকেরা বলেছেন, তুরস্ক তাদের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি সম্প্রসারণ শুরু করতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কৌশলগতভাবে অস্পষ্টতা বজায় রেখেছে। ২০২৫ সালের ইরান যুদ্ধের সময় পরিচালিত ‘রিসার্চ ইস্তাম্বুল’-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭১ শতাংশ পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

মিসর

এনপিটি স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে মিসরও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার জন্য একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি বজায় রেখেছে। দেশটির আল-দাবা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে রাশিয়ার মাধ্যমে নির্মাণাধীন রয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এটি ৪,৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তুরস্কের মতোই মিসরও তাদের ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির ক্ষেত্রে রাশিয়ার তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

চিকিৎসা গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় আইসোটোপ উৎপাদনের জন্য মিসরের গবেষণা চুল্লিও রয়েছে। মিসর ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের অধীন ইসরায়েলের মোকাবিলায় গোপনে একটি সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করেছিল, তবে তা ব্যর্থ হয়।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনটিআই-এর মতে, ১৯৬০-এর দশক থেকে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং তাদের পারমাণবিক ওয়ারহেড প্রায় ৯০টি। ইসরায়েলের কাছে আরও ৩০০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য পর্যাপ্ত ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম মজুত রয়েছে।

ইরাক

১৯৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের অধীন ইরাক গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করে বলে জানা যায়। দেশটি ফ্রান্সের কাছ থেকে ওসিরাক চুল্লি কিনে বাগদাদের কাছে তুওয়াইথা পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্রে স্থাপন করে।

১৯৮০–এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরান ওই চুল্লিতে হামলা চালায় এবং এক বছর পর ইসরায়েল এতে বোমাবর্ষণ করে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রও এ কেন্দ্রে হামলা চালায়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে আক্রমণের পর আইএইএ নিশ্চিত করে যে পারমাণবিক কর্মসূচিটি ধ্বংস হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎবিভ্রাট দূর করতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ইরাক চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বের চেষ্টা করেছে।

পাকিস্তান

মধ্যপ্রাচ্যের ঠিক পাশেই পাকিস্তান তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে মোকাবিলার জন্য উন্নত পারমাণবিক অস্ত্রের একটি বড় মজুত গড়ে তুলেছে। ভারতের যেখানে প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি রয়েছে, সেখানে পাকিস্তানের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে অস্পষ্ট।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর মতে, পাকিস্তানের ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিপরীতে ভারতের রয়েছে ১৯০টি। বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত সংঘাতের পর পাকিস্তান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্প্রসারিত করেছে বলে তারা বিশ্বাস করেন। পাকিস্তান বা ভারত কেউই এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি।

১৯৫০-এর দশকে আইজেনহাওয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ ছিল পাকিস্তানও। তবে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারতের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধে জড়িয়ে ১৯৭০-এর দশকে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে ছুটতে শুরু করে। ভারত নিজেও একই সময় পারমাণবিক পরীক্ষা শুরু করে।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সে সময় ঘোষণা করেন, ‘আমরা ঘাস খাব, এমনকি ক্ষুধার্ত থাকব, তবু নিজস্ব পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ছাড়ব।’

পারমাণবিক কর্মসূচিটি ছিল মূলত পদার্থবিজ্ঞানী আবদুল কাদের খানের নেতৃত্বে তৈরি। তিনি নাইজার থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করেছিলেন। পাকিস্তানের অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদিত হয় এর কাহুটা ও গাদওয়াল কেন্দ্রে।

পাকিস্তান ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং অস্ত্র ভাগাভাগি করেছে। ২০০৩ সালে নিজের দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ার পর লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি আইএইএর কাছে তাঁর দেশের পারমাণবিক অবকাঠামো সমর্পণ করেছিলেন।