পারমাণবিক আলোচনা আপাতত মুলতবি রেখে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং চলমান যুদ্ধ শেষ করতে নতুন একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছে ইরান। একজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এখন পুরোপুরি থমকে আছে। পারমাণবিক ইস্যুতে কতটা ছাড় দেওয়া যাবে, তা নিয়ে ইরানের নেতৃত্বের ভেতরেই মতভেদ তৈরি হয়েছে। ইরানের নতুন প্রস্তাবে এই জটিল বিষয়টিকে আপাতত এক পাশে সরিয়ে রেখে দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পথ খোঁজা হয়েছে।
তবে বিষয়টির একটি বড় ফাঁক আছে। অবরোধ তুলে নিলে এবং যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে ভবিষ্যতে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে এবং মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাত অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে। আর এ দুটি বিষয়কেই ট্রাম্প এই যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
আজ সোমবার ট্রাম্প তাঁর শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক দলের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন তিন মার্কিন কর্মকর্তা। একটি সূত্র বলেছে, শান্তি আলোচনায় স্থবিরতা এবং পরবর্তী সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করা হবে।
গতকাল রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখতে চান তিনি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেহরান নতিস্বীকার করবে বলেও তিনি আশা করছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ তেল যখন কোনো ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে এবং কোনো কারণে সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন ভেতর থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। তারা বলছে, এটা ঘটতে আর মাত্র তিন দিন বাকি।’
সপ্তাহান্তে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাকিস্তান সফর কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর আলোচনা নিয়ে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
হোয়াইট হাউস ঘোষণা করেছিল, ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইসলামাবাদে আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করবেন। কিন্তু ইরান এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সম্মতি দেয়নি। ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, ইরানের এই অবস্থানের কারণেই তিনি উইটকফ ও কুশনারের ওই সফর বাতিল করে দেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে তাঁদের ১৮ ঘণ্টার ফ্লাইটে পাঠানোর কোনো মানে দেখি না। এটা অনেক লম্বা সময়। ফোনেই কাজ হবে। ইরান চাইলে আমাদের ডাকতে পারে। শুধু বসে থাকার জন্য আমরা (ইসলামাবাদে) সফর করব না।’
গতকাল আরাগচি ওমানের রাজধানী মাসকটে গিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর দ্বিতীয় দফা আলোচনার জন্য আবার ইসলামাবাদে ফেরেন। আজ তাঁর মস্কো যাওয়ার এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র বলেছে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতেই পারমাণবিক ইস্যু বাদ রেখে এগিয়ে যাওয়ার এই পরিকল্পনা উত্থাপন করেন আরাগচি। একটি সূত্র জানিয়েছে, সপ্তাহান্তে পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের কাছে আরাগচি স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে ইরানের নেতৃত্বের ভেতরে কোনো ঐকমত্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি হলো, ইরানকে কমপক্ষে এক দশকের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখতে হবে এবং দেশে মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বাইরে সরিয়ে নিতে হবে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো ইরানের নতুন প্রস্তাবে প্রথমে হরমুজ প্রণালি ও নৌ অবরোধ সংকট সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে অথবা স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের একটি চুক্তি হবে। প্রণালি খুলে দেওয়া এবং অবরোধ উঠে যাওয়ার পরের ধাপে পারমাণবিক আলোচনা শুরু হবে।
হোয়াইট হাউস প্রস্তাবটি পেয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এটি বিবেচনায় নিতে রাজি কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘এগুলো স্পর্শকাতর কূটনৈতিক আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা করে না। প্রেসিডেন্ট যেমনটা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই সব তাস আছে এবং আমরা কেবল এমন চুক্তিতেই সই করব, যা মার্কিন জনগণকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেবে। ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না।’
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্ররা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।