
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজে হামলার ঘটনা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। উড়োজাহাজটির সহকারী পাইলট কেন প্রধান পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল কিংবা তিনি উড়োজাহাজটি নিয়ে কী করতে চেয়েছিলেন—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো অজানা।
ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা থাকলেও ফিরে আসা যাত্রীদের স্বাগত জানানোর মধ্যেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চলছে, এই হামলা তারই এক অনিবার্য পরিণতি।
এ ঘটনার কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি বলে স্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু। এরপরও তিনি এ ঘটনায় ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, বিদেশে ইসরায়েলি নাগরিকদের ওপর হামলা জোরদার করতে ইরান ও মিত্র গোষ্ঠীগুলো মরিয়া হয়ে উঠেছে।
চলতি মাসের শেষের দিকে ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির ক্ষমতায় থাকবেন কি না, তা নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন। ঠিক এই মোক্ষম সময়ে উড়োজাহাজে হামলার এ ঘটনাটি তাঁর পুরোনো রাজনৈতিক বয়ানকে এক নতুন প্রাণ দিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, উড়োজাহাজটির সহকারী পাইলট ‘ইসলামপন্থী উগ্রবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত’ ছিলেন।
যে রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ইসরায়েলিদের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে জাহির করে আসছেন, তাঁর জন্য ঘটনাটি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তাই ঘটনাটিকে তিনি উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছেন।
চলতি মাসের শেষের দিকে ইসরায়েলে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির ক্ষমতায় থাকবেন কি না, তা নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন। ঠিক এই মোক্ষম সময়ে উড়োজাহাজে হামলার এ ঘটনাটি তাঁর পুরোনো রাজনৈতিক বয়ানকে এক নতুন প্রাণ দিয়েছে।
এ ঘটনা থেকে নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি লাভবান হবেন বলে মনে করেন না ব্রেগম্যান। নির্বাচনী জরিপে এবার তিনি সামান্য ব্যবধানে হেরে যেতে পারেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এ ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে ঠিক কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা হয়তো একটু তাড়াহুড়া হয়ে যাবে। তবে এটি নিশ্চিতভাবেই নেতানিয়াহুকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতা থেকে এমন অনেক অস্বস্তিকর বিষয়কে এটি একঝটকায় সরিয়ে দিয়েছে, যা নেতানিয়াহু কোনোভাবেই দেখতে চান না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো—কিছুদিন পরই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের নজিরবিহীন হামলার বার্ষিকী।’
লেভি আরও বলেন, ৭ অক্টোবরের মতো বড় ব্যর্থতার স্মৃতিকে আড়াল করে সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় এখন খুব সহজেই উড়োজাহাজে ইরানের জড়িত থাকার নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে। ঠিক একই সময়ে যুক্তরাজ্যের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটির কাছে ঘটে যাওয়া অন্য একটি ঘটনার পেছনেও তেহরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার দাবি তোলা হচ্ছে।
‘নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবেই এই পুরো ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন।’—আহরোন ব্রেগম্যান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, কিংস কলেজ, লন্ডন
উড়োজাহাজে ব্যর্থ হামলার এ ঘটনাটি মূলত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে নতুন গতি দিতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি ইরানে নতুন করে তীব্র ও জোরালো হামলা শুরুর একটি বড় অজুহাত পাবেন।
একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও ব্যর্থতা থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে দিতে এবং চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া তাঁর নিরাপত্তা সতর্কবার্তাকে সত্য বলে প্রমাণ করতে সাহায্য করবে।
গত মঙ্গলবার নেতানিয়াহু একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন কিছু ইঙ্গিত আছে, নির্বাচনের আগে শত্রুরা আমাদের ওপর বড় ধরনের হামলা চালানোর চেষ্টা করবে।’
তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও নির্বাচনের আগে স্রেফ ‘ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
উড়োজাহাজের এই ঘটনাকে একটি ‘জিহাদি সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও প্রধানমন্ত্রীর সেই সতর্কবার্তার সুরে কথা বলেছেন। কাৎজ কড়া ভাষায় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আমি যখন কোনো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করি, তখন দেশের ভেতরের তথ্যহীন সাবেক কর্মকর্তা ও বাইরের শত্রু—সবারই উচিত তা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।’
তবে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সরকারের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাতে নেতানিয়াহুর কাছ থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি সরকারি নিরাপত্তা ব্রিফিং পেয়েছিলেন লাপিদ।
লাপিদ স্পষ্ট করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সেই নিরাপত্তাবিষয়ক ব্রিফিংয়ে উড়োজাহাজে হামলার মতো কোনো বিষয়ের ন্যূনতম আভাস বা কাছাকাছি কোনো বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়নি।’
বিরোধীদের দাবি, সরকার স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও নির্বাচনে ফায়দা লুটতেই দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে ব্যবহার করে সস্তা চাল চালছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে যাঁরা বহু বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করছেন, তাঁদের কাছে উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের এই ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনার পর তাঁর পদক্ষেপগুলো খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। যেকোনো বড় সংকট বা বিপর্যয় ঘটার পর সেটিকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেন তিনি।
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আহরোন ব্রেগম্যান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবেই এই পুরো ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন।’ উড়োজাহাজের যাত্রীরা ইসরায়েলে অবতরণ করার পরপরই সহকারী পাইলটকে কাবু করা এক ইসরায়েলি যাত্রীর সঙ্গে নেতানিয়াহুকে কথা বলতে ও ছবি তুলতে দেখা যায়।
তবে এ ঘটনা থেকে নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি লাভবান হবেন বলে মনে করেন না ব্রেগম্যান। নির্বাচনী জরিপে এবার তিনি সামান্য ব্যবধানে হেরে যেতে পারেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার একমাত্র সম্ভাবনা হতে পারে যদি এই ঘটনার সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়। সে ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত আরও বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এই ব্যর্থ চেষ্টার পেছনে কারা ছিল, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এ কথা স্বীকার করার পরও সহকারী পাইলটের এই আচরণকে অকল্পনীয় ধর্মান্ধতা ও ঘৃণার পরিণতি বলে বর্ণনা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে চলা সমালোচনাই এই ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ মনোভাব উসকে দিয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যায় ইতিমধ্যে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোয় উপর্যুপরি হামলা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের এই তীব্র ক্ষোভের মধ্যে নেতানিয়াহু নিজেকে ও নিজের দেশকে বিশ্ব রাজনীতির ‘বলি’ বা ‘নিপীড়নের শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচারও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, ইসরায়েল ইতিমধ্যে সাতটি যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করছে। এখন তারা অষ্টম যুদ্ধক্ষেত্রের মুখোমুখি হয়েছে। এই অষ্টম যুদ্ধক্ষেত্রকে ‘সত্যের যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে তিনি আল–জাজিরাসহ বিশ্বের মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে এর জন্য দায়ী করেন।
নেতানিয়াহুর অভিযোগ, এসব গণমাধ্যম তরুণ সমাজকে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে ‘মগজধোলাই’ করছে।
আল–জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক নেতানিয়াহুর এই অভিযোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা একে আল–জাজিরা ও প্রতিষ্ঠানটির সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ধারাবাহিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের অংশ বলে বর্ণনা করেছে। গাজায় ইতিমধ্যে আল–জাজিরার ১২ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।