জেমিমা গোল্ডস্মিথ
জেমিমা গোল্ডস্মিথ

সাবেক স্বামী ইমরান খানের অধিকার রক্ষায় যুক্তরাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চান জেমাইমা

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে অমানবিক আচরণ ও তাঁর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁর সাবেক স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথ। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ইমরানের চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেমাইমা বলেন, পাকিস্তান সরকারকে অবশ্যই নিজেদের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ইমরানের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ, পরিবারের সঙ্গে দেখা করার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে এবং তাঁর দীর্ঘদিনের একাকী বন্দিত্বের অবসান ঘটাতে হবে।

১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখানে একটি চিকিৎসা বোর্ডের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসার কথা বলা হয়েছিল।

তবে পাকিস্তান সরকার ইমরানকে শিফা হাসপাতালে না নিয়ে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিআইএমএস) চিকিৎসার জন্য নেয়। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে সুস্থ ঘোষণা করলে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ ঘটনায় ইমরানের খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে গত শনিবার সুপ্রিম কোর্টে সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার পিটিশন দায়ের করে দলটি।

জেমাইমা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, ‘যুক্তরাজ্য আর কত দিন নীরব থাকবে?’

জেমাইমা অভিযোগ করেন, প্রায় তিন বছর ধরে কারাগারে থাকা ইমরানকে দীর্ঘ সময় একাকী রাখা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি আইনজীবী ও চিকিৎসকদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ সীমিত করা হয়েছে।

ইমরানের সাবেক স্ত্রী আরও বলেন, ইমরান প্রায় তিন বছর ধরে একাকী বন্দিত্বে আছেন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রায় ১০ মাস ধরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা বিধির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ওই বিধি অনুযায়ী টানা ১৫ দিনের বেশি একাকী বন্দিত্ব নিষিদ্ধ।

ইমরান খান

জেমাইমা বলেন, ইমরানের চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করেছেন। আদালত তাঁকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা, ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ, পরিবারের নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে সপ্তাহে দুবার ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এসব নির্দেশ অমান্য করা হচ্ছে।

ইমরানের সাবেক স্ত্রীর মতে, বিষয়টি এখন আর শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তাই যুক্তরাজ্যের উচিত এ বিষয়ে প্রকাশ্যে এবং স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া।

ইমরান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে আছেন। বর্তমানে ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতির মামলায় তিনি আদিয়ালা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। ২০২৩ সালের ৯ মে সংঘটিত বিক্ষোভের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন।

ইমরানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছেন জেমাইমা। তিনি বলেন, ইমরান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং কয়েক বছর ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে খেলেছেন।

জেমাইমা আরও বলেন, ইমরানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের। পাকিস্তানে প্রথম বিনা মূল্যের ক্যানসার হাসপাতাল এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো জনকল্যাণমূলক কাজের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

নিজের দুই ছেলে সুলায়মান ও কাসিমের পক্ষ থেকেও আবেদন জানিয়েছেন জেমাইমা। তিনি বলেন, হাজার হাজার মাইল দূর থেকে তাঁরা তাঁদের বাবার স্বাস্থ্যের অবনতি দেখছেন।

ইমরানের সাবেক স্ত্রীর অভিযোগ, তাঁর দুই ছেলেকে ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তাঁদের ভিসা দেওয়া হয়নি এবং পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে তাঁদের গ্রেপ্তারের হুমকিও দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলার সুযোগও তাঁদের দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জেমাইমা বলেন, যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, তাঁর দুই ছেলে বাবাকে দেখতে পাকিস্তানে গেলে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হলেও যুক্তরাজ্য হস্তক্ষেপ করবে না।

ইমরানের সাবেক স্ত্রী আরও বলেন, পাকিস্তান কমনওয়েলথভুক্ত একটি দেশ। নির্বিচার আটক, অমানবিক আচরণ ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনবিরোধী অবস্থান নেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে যুক্তরাজ্যের। এসব নীতি শুধু সুবিধাজনক সময়ে প্রয়োগ করলে তার কোনো অর্থ থাকে না।

আগস্টের শুরুতে ইমরানের দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলায়মান খানও তাঁদের বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কয়েক মাস ধরে পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।

ইমরান খান ও তাঁর সাবেক স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথ

ছেলেদের দাবি, ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে তাঁরা বাবাকে দেখেননি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর পাননি।

ইমরান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে আছেন। বর্তমানে ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতির মামলায় তিনি আদিয়ালা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। ২০২৩ সালের ৯ মে সংঘটিত বিক্ষোভের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন।

তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় কাসিম ও সুলায়মানের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাঁদের দুজনেরই বিদেশি পাকিস্তানিদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে ভিসা ছাড়াই পাকিস্তানে প্রবেশ করা যায়। তবে ইমরানের ছেলেরা বলেছেন, তাঁদের পরিচয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং সেগুলো নবায়ন করা হয়নি।

এর আগে গত ২৬ মার্চ জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে কাসিম খান তাঁর বাবার মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইমরানকে দীর্ঘদিন ধরে একাকী বন্দিত্বে রাখা হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।

কাসিম বলেন, বাবার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখেও নীরব থাকা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়।