পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাঙ্গু জেলার একটি পুলিশ তল্লাশিচৌকির ছাদ মাছ ধরার জালে ঢেকে রাখা হয়েছে
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাঙ্গু জেলার একটি পুলিশ তল্লাশিচৌকির ছাদ মাছ ধরার জালে ঢেকে রাখা হয়েছে

ড্রোন হামলা ঠেকাতে পাকিস্তানের অস্ত্র এখন মাছ ধরার জাল

পাকিস্তানের উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে চলতি বছর একটি তল্লাশিচৌকিতে বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। সে সময় পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খান ও তাঁর সহকর্মীরা আত্মরক্ষায় দ্রুত নিচু হয়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেন।

গত ১৬ এপ্রিলের ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), যা সাধারণভাবে পাকিস্তান তালেবান নামে পরিচিত।

ড্রোন হামলা চালানোর পর টিটিপির যোদ্ধারা হাঙ্গু জেলার সারকি পিয়ালা পুলিশ চৌকি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলি চালান। চৌকিটি আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার (১৮ মাইল) দূরে। এলাকাটি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে টিটিপির প্রাণঘাতী হামলার অন্যতম কেন্দ্র।

এ ধরনের জাল দিয়ে একটি সাধারণ পুলিশ চৌকি ঢাকতে প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি (১ হাজার ৪৩৫ ডলার) খরচ হয়।

প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষে একটি সাঁজোয়া গাড়ির চালক নিহত ও এক কনস্টেবল আহত হন বলে জানান ৪০ বছর বয়সী পুলিশ পরিদর্শক ফাইয়াজ খান।

ফাইয়াজ খান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। কারণ, আমরা তখন যুদ্ধের মাঝখানে ছিলাম। সেই মুহূর্তে আমরা এটাও জানতাম না যে শেষ পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারব কি না।’

এ ধরনের হামলা ঠেকাতে হাঙ্গুর পুলিশ কম খরচের অভিনব একটি ব্যবস্থা নিয়েছে—তল্লাশিচৌকির ছাদ ও সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে কয়েক মিটার উঁচুতে মাছ ধরার জাল টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে চৌকি প্রাঙ্গণের ওপরের আকাশে একটি ছাদের মতো ছাউনি তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, সহজে তৈরি করা যায় এবং জেলেরা মাছ ধরার কাজে যে ধরনের জাল ব্যবহার করেন, দেখতে অনেকটা সে রকম এ জাল দুই মাস আগে প্রথম বসানো হয়। এর পর থেকে সারকি পিয়ালা পুলিশ তল্লাশিচৌকিতে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি বলে জানান ফাইয়াজ।

হামলাকারী ড্রোন জালে আটকে না পড়ে জালের ওপর বিস্ফোরিত হলেও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হবে বলে আমাদের ধারণা। কারণ, বিস্ফোরণের বেশির ভাগ শেল ও টুকরা বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে, সরাসরি নিচে পড়বে না; যেখানে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করেন।
ফাইয়াজ খান, পুলিশ কর্মকর্তা

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘(এখন) কোনো ড্রোন চৌকির ওপর দিয়ে এলে জালে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এতে সেটি নিষ্ক্রিয় করা বা থামানো সম্ভব হতে পারে।’

ফাইয়াজ যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা দড়ি ও তার দিয়ে জোড়া লাগানো কালো জালের ছাউনির নিচে সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের গায়ে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হাতে অস্ত্র।

ফাইয়াজ খান বলেন, ‘হামলাকারী ড্রোন জালে আটকে না পড়ে ওপরে বিস্ফোরিত হলেও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হবে বলে আমাদের ধারণা। কারণ, বিস্ফোরণের বেশির ভাগ শেল ও টুকরা বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে, সরাসরি নিচে পড়বে না; যেখানে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান করেন।’

হাঙ্গু জেলা পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব আল–জাজিরাকে বলেন, এ ধরনের জাল দিয়ে একটি সাধারণ পুলিশ চৌকি ঢাকতে প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি (১ হাজার ৪৩৫ ডলার) খরচ হয়।

তারিক হাবিব আরও বলেন, ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার হামলার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ পুলিশ স্টেশন ও চৌকিগুলোয় পুলিশ এ জাল ব্যবস্থার প্রচলন করেছে।

পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে অস্ত্র হাতে এক তালেবান যোদ্ধা

জেলাজুড়ে বিভিন্ন পুলিশ স্টেশনে আরও জাল বসানোর কাজ চলছে বলেও জানান তারিক হাবিব। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে হাঙ্গু পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাদেশিক সরকারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, আরও অন্তত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলা—কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানের চেকপোস্ট ও পুলিশ ফাঁড়িতে এ জাল বসানো হয়েছে। প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় সামরিক চৌকিতেও ড্রোন ঠেকাতে এ জাল ব্যবহার করা হচ্ছে।

‘নিরাপত্তার বাড়তি স্তর’

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার কৌশলে পরিবর্তন আসার পরিপ্রেক্ষিতে এসব মাছ ধরার জাল বসানো হয়েছে। এখন তারা গুলিবর্ষণ ও মর্টার হামলার পাশাপাশি ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা বেড়েছে। এসব হামলার মূল লক্ষ্য পুলিশ ও সামরিক বাহিনী। এর অনেকগুলোর দায় স্বীকার করেছে টিটিপি। গোষ্ঠীটি বলছে, পাকিস্তানে তালেবানের আদলে ধর্মভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে তারা।

খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশের এক মুখপাত্র বলেন, আরও অন্তত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলা—কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানের চেকপোস্ট ও পুলিশ ফাঁড়িতে এই জাল বসানো হয়েছে। প্রদেশটির কয়েকটি এলাকায় সামরিক চৌকিতেও ড্রোন ঠেকাতে এ জাল ব্যবহার করা হচ্ছে।

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বারবার অভিযোগ করে আসছেন, কাবুলের তালেবান সরকার তাদের ভূখণ্ডে টিটিপিকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা পাকিস্তানের ভূখণ্ডে সীমান্তের ওপার থেকে হামলা ঠেকাতে টিটিপিকে বাধা দেওয়ার দাবিও জানিয়ে আসছে।

তবে কাবুল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এসব হামলা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়।

হাঙ্গুতে এ ধরনের হামলার মধ্যে গত ২৯ জুলাই সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা সেদিন বোমাযুক্ত কোয়াডকপ্টার দিয়ে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালানোর পর স্থলপথে হামলা শুরু করেন। এতে অন্তত ১১ পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এ হামলায় ১৫ হামলাকারীও নিহত হন। টিটিপি হামলার দায় স্বীকার করেছে।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে আরেক দফা গোলাগুলিতে ছয় সেনা ও আট হামলাকারী নিহত হন। এর দুদিন আগে আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইত্তেহাদ–উল–মুজাহিদিন পাকিস্তান খাইবার পাখতুনখাওয়ার কোহাট জেলায় সমন্বিত হামলা চালায়। এতে ১৬ পুলিশসহ ২৩ জন নিহত হন। হামলাকারীরা একটি মসজিদেও বোমা হামলা চালান।

তবে পুলিশ কর্মকর্তা জিশান খান বলেন, মাছ ধরার জাল বসানোর পর থেকে সারকি পিয়ালা ও কাছের বালিয়ামেনা চৌকিতে কোনো ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার হামলা হয়নি। তিনি বলেন, ‘এ জাল পুলিশ সদস্যদের জন্য নিরাপত্তার বাড়তি স্তর হিসেবে কাজ করছে। হামলা হলেও আমরা যে ব্যবস্থা নিয়েছি, তা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে।’

এই কর্মকর্তার ধারণা, অভিনব এ ব্যবস্থা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।