
আফগানিস্তানের তিনটি প্রদেশে গত রোববার রাতভর ‘সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী’র আস্তানায় আঘাত হেনেছে পাকিস্তান। এমন দাবি ইসলামাবাদের। পরদিন গতকাল সোমবার সকালে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূতকেও তলব করেছে পাকিস্তান সরকার। এর আগে গত সপ্তাহে করাচিতে সিন্ধু রেঞ্জার্সের একটি ঘাঁটিতে হামলায় পাকিস্তানের আধা সামরিক বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হন। আহত হন চারজন।
রোববারের হামলা নিয়ে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের দাবি, আফগানিস্তানের পাকতিয়া, পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে এই হামলা চালানো হয়েছে। এতে ২৫ জন ‘সশস্ত্র যোদ্ধা’ নিহত হয়েছেন। একই রাতে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বাজাউর এলাকায় আলাদা একটি স্থল অভিযানে জামাত-উল-আহরারের (জেইউএ) একজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারসহ বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
টিটিপির সঙ্গে জেইউএর সম্পর্ক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০৭ সালে টিটিপি গঠিত হয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এখনো এটি প্রধান সশস্ত্র নেটওয়ার্ক।
করাচিতে গত সপ্তাহে হামলার দায় স্বীকার করেছিল এই জেইউএ। গোষ্ঠীটি হলো তেহরিক-ই-তালেবানের একটি শাখা। তারা পাকিস্তান তালেবান বা টিটিপি নামেও পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া বহু ভয়াবহ বোমা হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে হাত রয়েছে টিটিপির। পাকিস্তানের অভিযোগ, এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার।
আফগানিস্তানের শাসক তালেবানরা টিটিপির চেয়ে আলাদা। তারা দাবি করেছে, রোববার পাকিস্তানের হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ হামলায় আহত শিশুদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, রোববার পাকিস্তান আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এতে ডজনখানেক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
কোনো পক্ষের দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি আল-জাজিরা। তবে গত সপ্তাহে করাচিতে হামলা, আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এখন একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালানোর পরও নিজ ভূখণ্ডে বোমা হামলা ও হত্যাকাণ্ডে শিকার হচ্ছে পাকিস্তান। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিজেদের কৌশল পুনর্মূল্যায়নের সময় এসেছে ইসলামাবাদের।
করাচিতে সিন্ধু রেঞ্জার্সের ঘাঁটিতে হামলা হয় ২৭ জুন। জেইউএ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। ওই হামলায় তিন রেঞ্জার্স সদস্য নিহত হন। পাল্টা গুলিতে তিন হামলাকারী নিহত হন। এক হামলাকারীকে জীবিত আটক করা হয়। পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, আটক ব্যক্তির নাম উসমান আলী। তিনি আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জেইউএর ঘাঁটি নানগারহার প্রদেশে। পাকিস্তানের তদন্তকারীদের ভাষ্য, উসমান আলী জানিয়েছেন, তাঁদের দলটি হামলার সাত দিন আগে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিল। এই হামলা ছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর করাচিতে সবচেয়ে বড় পরিসরে হামলা। সে সময় টিটিপি যোদ্ধারা করাচির একটি পুলিশ কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছিলেন।
জাতিসংঘের হিসাবে, পাকিস্তানের হামলায় ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে অন্তত ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৩৯৭ জন আহত হয়েছেন।
টিটিপির সঙ্গে জেইউএর সম্পর্ক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০৭ সালে টিটিপি গঠিত হয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এখনো এটি প্রধান সশস্ত্র নেটওয়ার্ক। ইসলামাবাদের মতে, টিটিপি মূলত আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত হয়। ২০১৪ সালে টিটিপি থেকে আলাদা হয় জেইউএ। ২০২০ সালে আবার যোগ দেয়। তবে ২০২৫ সালের প্রথম দিকে আবার আধা স্বাধীন অবস্থায় চলে যায় জেইউএ।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে টিটিপি যখন নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের ঘোষণা দেয়, তখন জেইউএ কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ পায়নি। যদিও দুই পক্ষের মধ্যে তখন আনুষ্ঠানিক কোনো ফাটলের ঘোষণাও আসেনি। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠী বিশেষজ্ঞ এহসানুল্লাহ টিপু মসিদ বলেন, করাচির হামলাটি মূলত নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করার জন্য জেইউএর একটি চেষ্টা ছিল।
টিপু মসিদের ভাষ্যমতে, জেইউএ এই হামলা করে বার্তা দিতে চেয়েছে, পাকিস্তানের ভেতরে বড় ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা তাদের এখনো রয়েছে। গোষ্ঠীটি দেখাতে চায়, টিটিপির সাহায্য ছাড়াই তারা গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নিরাপত্তা স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একাধিক হামলাকারী পাঠাতে পারে।
আগে থেকেই টিটিপি নেটওয়ার্কের মধ্যে সবচেয়ে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম জেইউএ। ২০১৬ সালে লাহোরের গুলশান-ই-ইকবাল পার্কে ইস্টার সানডের দিন বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছিল তারা। ওই হামলায় ৭০ জনের মানুষ বেশি নিহত হয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইসলামাবাদের এক আদালত চত্বরে আত্মঘাতী বোমা হামলয় ১২ জন নিহত হন। সেটিও এই গোষ্ঠীর কাজ বলে ধারণা করা হয়।
পাকিস্তানের জবাব একটি চেনা ছক অনুসরণ করে চলেছে। একটি বড় হামলার ঘটনা ঘটে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আফগান সীমান্তে বিমান হামলা চালানো হয়। ইসলামাবাদ সতর্কতা জারি করে। কাবুল বেসামরিক মানুষের হতাহতের নিন্দা জানায়। আর এই চক্র চলতেই থাকে।
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের মতে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে হামলা ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটিতে ওই বছর ৬৯৯টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১ হাজার ৩৪ জন নিহত এবং আরও ১ হাজার ৩৬৬ জন আহত হয়েছেন। ৯৫ শতাংশের বেশি হামলা ছিল খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশকে কেন্দ্র করে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান ‘অপারেশন গজব লিল হক’ শুরু করেছে। এই অভিযানের মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলজুড়ে বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও স্থল অভিযান। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ১০ লাখ আফগান নাগরিককে বহিষ্কার করেছে ইসলামাবাদ।
আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির আলোচনা চালিয়েছে পাকিস্তান। এর মধ্যে কিছু আলোচনা সাময়িক সহিংসতা কমাতে সাহায্য করেছে। তবে স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞ এহসানুল্লাহ টিপু মসিদ বলেন, বারবার একই চক্র ঘুরেফিরে আসাটা পাকিস্তানের বৃহত্তর সন্ত্রাস দমন কৌশলের গভীর ত্রুটিগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছে। দেশটির সন্ত্রাস দমন কৌশলের মূল ত্রুটি হলো ধারাবাহিকতার অভাব এবং শক্তির ব্যবহারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা।
পাকিস্তান একই সঙ্গে আফগানিস্তানের ওপর সামরিক চাপ দিচ্ছে এবং কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন—এই দুটি পদ্ধতির কোনোটিই সঠিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি কি না?
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আফগানিস্তান বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস বলেন, মূল ধারণাটি হলো, তালেবানের কঠোর পদক্ষেপ পাকিস্তানের ভেতরে সহিংসতা কমিয়ে দেবে। কিন্তু এ ধারণা যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।
ইব্রাহিম বাহিস বলেন, টিটিপির বিভিন্ন পর্যায়ে আফগানদের কাজ করার প্রমাণ রয়েছে। তবে এটা প্রমাণ করে না, আফগান সরকার টিটিপির হামলাগুলো পরিচালনা বা সমর্থন করছে। আর পাকিস্তানে প্রতিটি বড় হামলাকে আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার ইসলামাবাদের প্রবণতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে করেন ইব্রাহিম বাহিস।
জাতিসংঘের হিসাবে, পাকিস্তানের হামলায় ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে অন্তত ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৩৯৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মার্চ মাসে কাবুলের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ডজনখানেক মানুষও রয়েছেন।
আফগানিস্তানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সামি ইউসুফজাই বলেন, বেসামরিক মানুষের এই মৃত্যু আফগানিস্তানের জনমতকে বদলে দিচ্ছে।
সামি ইউসুফজাই আল-জাজিরাকে বলেন, অনেক আফগান এখন বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানের হামলা তালেবান সরকার নিয়ে অনেক আলোচনাকে বদলে দিচ্ছে। এমনকি যেসব আফগান নারী শিক্ষা নিয়ে তালেবানি নীতির সমালোচনা করতেন, তাঁরাও এখন আগে পাকিস্তানের আগ্রাসন নিয়ে কথা বলতে চান। এভাবে পাকিস্তান মূলত তালেবানকে একটি বয়ান সৃষ্টির সুযোগ করে দিচ্ছে। আর তালেবানরা তা খুব কার্যকরভাবে কাজে লাগাচ্ছে।