গর্ভের শিশুর কাছে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেওয়া এবং গর্ভকালজুড়ে শিশুর বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গর্ভফুল
গর্ভের শিশুর কাছে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেওয়া এবং গর্ভকালজুড়ে শিশুর বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গর্ভফুল

হাসপাতাল থেকে বিদেশে, পাকিস্তানে গর্ভফুলের গোপন বাণিজ্য

বাড়িটির বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না ভেতরে কী চলছে! দেখতে সাধারণ আবাসিক ভবন মনে হলেও ভেতরে ট্রলির ওপর সারি সারি ট্রেতে সাজানো সন্তান ভূমিষ্ঠের পর প্রসূতিদের গর্ভফুল (প্লাসেন্টা)।

হাসপাতাল থেকে সংগ্রহের পর এসব গর্ভফুল শুকিয়ে রাখা হয়েছে। বাড়িটিতে চলছিল প্লাসেন্টা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজ।

পাকিস্তানের তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, এখান থেকেই বিদেশে পাচার করা হতো এ মানব গর্ভফুল। পরে সেগুলো ব্যবহার করে তৈরি করা হতো উচ্চ মূল্যের অ্যান্টি-এজিং (বার্ধক্যরোধী) ইনজেকশন।

এমন অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ)।

এফআইএর ভাষ্য, বিদেশে পাঠানোর পর এসব গর্ভফুল দিয়ে বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন তৈরি করা হতো। প্রতিটি ইনজেকশনের বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ রুপি (২ হাজার ৫৩০ ডলার)।

গত সপ্তাহে রাজধানী ইসলামাবাদে অভিযান চালিয়ে অবৈধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রটি থেকে প্রায় ৫০০ কেজি গর্ভফুল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচজনকে।

এফআইএর প্রকাশ করা ছবিতে দেখা যায়, বাড়িটিকে গর্ভফুল সংরক্ষণ ও শুকানোর একটি অস্থায়ী কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এফআইএ বিবিসি উর্দুকে জানিয়েছে, চক্রটি প্রতি মাসে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রায় ২০০ কেজি (৪৪০ পাউন্ড) গর্ভফুল সংগ্রহ করত। সেগুলো শুকিয়ে এবং প্রক্রিয়াজাত করার পর বিদেশে পাঠাত।

ইসলামাবাদের ওই বাড়িতে অভিযানের পর ১ জুলাই ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে আরও একটি চালান জব্দ করেছে এফআইএ। প্রায় ১০০ কেজি মানবদেহের এই টিস্যু ভিয়েতনামে পাঠানো হচ্ছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

হাসপাতাল থেকে কেনা হতো গর্ভফুল

পাকিস্তানের হিউম্যান অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট অথরিটির কর্মকর্তা হিনা কানওয়াল বলেন, পাঁচ সন্দেহভাজন ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রতিটি গর্ভফুল প্রায় ৮০০ রুপিতে (২ দশমিক ৯০ মার্কিন ডলার) কিনতেন।

এফআইএর ভাষ্য, বিদেশে পাঠানোর পর এসব গর্ভফুল দিয়ে বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন তৈরি করা হতো। প্রতিটি ইনজেকশনের বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ রুপি (২ হাজার ৫৩০ ডলার)।

তদন্ত সংস্থাটির ধারণা, এ নেটওয়ার্ক শুধু ইসলামাবাদে সীমাবদ্ধ নয়; লাহোর, পেশোয়ার, রাওয়ালপিন্ডিসহ আরও কয়েকটি বড় শহরে এর কার্যক্রম বিস্তৃত। সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হাসপাতাল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ও অভিবাসন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এফআইএর একজন কর্মকর্তা বিবিসি উর্দুকে বলেন, সংস্থাটি ‘অবৈধ মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযান’ পরিচালনা করেছে। তবে ‘মানব প্লাসেন্টা পাচারকে কেন্দ্র করে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সন্ধান’ এবারই প্রথম পাওয়া গেল।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গ্রেপ্তার পাঁচ সন্দেহভাজন প্রথমে দাবি করেছিলেন, তাঁরা ভেড়ার গর্ভফুল নিয়ে কাজ করছিলেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন, সেগুলো মানুষের ছিল।

পাকিস্তানের আইনে মানব অঙ্গ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সংগ্রহ বা পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে।

প্লাসেন্টা ‘অত্যন্ত সংক্রামক চিকিৎসাবর্জ্য’। তাই এটি অপসারণ ও ধ্বংস করার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আছে।
সাদাফ তারিক, পাকিস্তানের স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ

গর্ভফুল নিয়ে আগ্রহ কেন

প্লাসেন্টা হলো গর্ভাবস্থায় জরায়ুর ভেতরে তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী অঙ্গ। এটি গর্ভের শিশুর কাছে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয় এবং গর্ভকালজুড়ে শিশুর বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সন্তান জন্মের পর এটি মায়ের শরীর থেকে বেরিয়ে আসে এবং তখন এর স্বাভাবিক ভূমিকার সমাপ্তি ঘটে।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো পাকিস্তানেও শিশুর জন্মের পর প্লাসেন্টাকে চিকিৎসাবর্জ্য হিসেবে ধ্বংস করা হয়। এ কাজ শুধু সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান করতে পারে এবং পুরো প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নথি সংরক্ষণ করতে হয় হাসপাতালগুলোকে।

পাকিস্তানের স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ সাদাফ তারিক বলেন, প্লাসেন্টা ‘অত্যন্ত সংক্রামক চিকিৎসাবর্জ্য’। তাই এটি অপসারণ ও ধ্বংস করার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আছে।

তবে কেউ কেউ মনে করেন, প্লাসেন্টায় প্রোটিন, আয়রন ও চর্বি থাকায় তা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপকারী। কোথাও কোথাও এটি দিয়ে ওষুধ ও ইনজেকশনও তৈরি করা হয়। কারও কারও দাবি, এ ওষুধ ও ইনজেকশন টিস্যু পুনর্গঠনে বা বার্ধক্যের প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে।

তবে এসব দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত এবং দেশভেদে এ-সংক্রান্ত আইন ও বিধিনিষেধও ভিন্ন।