
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে অনেক লক্ষ্য অর্জন করেছে। এমন একটি লক্ষ্য হলো চীনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—আমেরিকা থেকে দূরে থাকো।
দুই দশক ধরে লাতিন আমেরিকায় ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে চীন। অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় কৌশলগত অবস্থান তৈরি করাও ছিল বেইজিংয়ের বড় লক্ষ্য। ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ, আর্জেন্টিনায় স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং স্টেশন, পেরুতে বন্দর—সব মিলিয়ে অঞ্চলটিতে চীনের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিরক্তি
লাতিন আমেরিকায় চীনের অগ্রগতি শুধু বর্তমান নয়, অতীতের একাধিক মার্কিন প্রশাসনের জন্যও বিরক্তির কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পেছনে চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে কাজ করেছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, ঋণ ও জ্বালানি তেলের বিনিময়ে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চীনের গড়ে ওঠা সম্পর্কের ‘ইতি টানতে’ এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞায় থাকা ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেল এত দিন পর্যন্ত মূলত চীনে যাচ্ছিল। এখন তা যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হবে।
‘আমরা আপনাদের এখানে চাই না’
গত শুক্রবার তেল খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে এক বৈঠকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে চীন ও রাশিয়ার উপস্থিতি নিয়ে অস্বস্তির কথা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘আমরা চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। কিন্তু এ অঞ্চলে “প্রতিবেশী” হিসেবে তাদের চাই না।’
ট্রাম্প বলেন, ‘চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনতে পারে, কিন্তু লাতিন আমেরিকায় কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।’
অভিযানের প্রতীকী তাৎপর্য
৩ জানুয়ারি ভোররাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। অভিযানের শুরুর দিকে লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রায় সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হয়। এসবের অধিকাংশ চীন ও রাশিয়া থেকে কেনা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের মধ্য দিয়ে চীনের সামরিক প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব—দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশ্লেষক ক্রেইগ সিংলেটন বলেন, ‘চীনের বড় শক্তিতে পরিণত হওয়ার ধারণা এবং বাস্তবতার মধ্যকার ফাঁক—এই অভিযানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়েছে।
কূটনৈতিক প্রতিবাদ, কিন্তু সীমাবদ্ধতা
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘একতরফা ও বেআইনি’ বলে নিন্দা জানিয়েছে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস। দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, ‘লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, অঞ্চলটির দেশগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে—চীন কূটনৈতিক আশ্বাস দিতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনে তাদের রক্ষা করতে পারে না। সেই সক্ষমতা চীনের নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ভেনেজুয়েলার ঘটনায় চীনের সীমিত প্রতিক্রিয়া অঞ্চলটির অন্য দেশগুলোকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি চাপের মুখে পড়লে বেইজিং কতটা পাশে দাঁড়াতে পারবে, সে প্রশ্ন নিয়ে এখন অঞ্চলজুড়ে আলোচনা হচ্ছে।
বৃহত্তর কৌশলের ইঙ্গিত
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা অভিযান শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং এটি ‘পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের সীমানা’ নতুন করে নির্ধারণের প্রচেষ্টা। তবে একই সঙ্গে এ আশঙ্কাও রয়েছে—অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় জড়িয়ে যায়, তাহলে সেখানে চীন আবারও সুযোগ নিতে পারে।
কূটনীতিক ও গবেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এ কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘প্রভাব বলয়’ভিত্তিক চিন্তাকে আরও জোরালো করতে পারে। এতে ওয়াশিংটন যেমন লাতিন আমেরিকায় কর্তৃত্ব ধরে রাখতে চাইবে, তেমনি বেইজিংও এশিয়ায় নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করার যুক্তি খুঁজতে চেষ্টা করবে।